নীলস বোর এর জীবনী | Biography of Niels Bohr

নীলস-বোর-এর-জীবনী | Biography of Niels Bohr

May 15, 2025 - 00:00
May 17, 2025 - 01:21
 0  1
নীলস বোর এর জীবনী | Biography of Niels Bohr

বিজ্ঞানী নীলস বোর পরমাণু মডেল

নিল্‌স হেনরিক ডেভিড বোর:

(৭ অক্টোবর, ১৮৮৫ - ১৮ নভেম্বর, ১৯৬২) হলেন পরমাণু গঠনের আধুনিক তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা ও বিখ্যাত পদার্থবিদ। এই ডেনীয় পদার্থবিজ্ঞানী ১৯২২ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বোরের পরমাণু মডেল রসায়নের ইতিহাসে আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি মূলত অবদান রাখেন পদার্থের আণবিক গঠন এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের উপর যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তিনি পরমাণু মডেলকে সূর্যের কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান গ্রহের সাথে তুলনা করেন যেখানে পরমাণুর কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস অবস্থিত এবং নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন অবস্থিত।

১৯১২ সালে মারগ্রেথ নোরলান্ড নামীয় রমণীকে বিয়ে করেন। তাদের সন্তানদের একজন ছিলেন অউ নিলস বোর। তিনিও গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ১৯৭৫ সালে তাকেও নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল।

ম্যানহাটন প্রকল্প নামে পরিচিত পদার্থবিদদের একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়াও, বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথেও একযোগে কাজ করেছেন। তাকে বিংশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিদদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রারম্ভিক জীবন

বোর ১৮৮৫ সালের ৭ই অক্টোবর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ক্রিশ্চিয়ান বোর ছিলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক, এবং মাতা এলেন অ্যাডলার বোর ব্যাংকিং ও সংসদীয় গোত্রে প্রখ্যাত ও ধনাঢ্য ডেনীয় ইহুদি পরিবারের কন্যা ছিলেন। নিল্‌স তার পিতামাতার তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তার বড় বোন জেনি এবং ছোট ভাই হ্যারাল্ড। জেনি পরবর্তীকালে শিক্ষকতা করতেন, এবং হ্যারাল্ড গণিতজ্ঞ ও ফুটবলার ছিলেন, যিনি লন্ডনে ১৯০৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ডেনীয় জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন। নিলসও ফুটবলার ছিলেন। তারা দুই ভাই কোপেনহেগেনভিত্তিক আকাদেমিস্ক বল্ডক্লুবের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছিলেন, যেখানে নিল্‌স গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

বোর সাত বছর বয়সে গেমেলহোম লাতিন স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানে পড়াশোনা করেন। ১৯০৩ সালে বোর কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। তার অধ্যয়নের বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞান। তিনি অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান ক্রিশিয়ানসেনের অধীনে এই বিষয় অধ্যয়ন করতেন, কারণ সে সময়ে তিনিই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের একমাত্র শিক্ষক ছিলেন। তিনি থরভাল্ড থেলের অধীনে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তার পিতার বন্ধু অধ্যাপক হ্যারাল্ড হফডিঙের অধীনে মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন।

নোবেলজয়ী নিলস বোর

সাল ১৯১১। কোপেনহেগেন থেকে ডক্টরেট শেষ করে ইংল্যান্ড আসেন বোর। সেটা ছিল এক বছরের সফর। এই সফর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ইলেকট্রনের আবিষ্কারক জে জে থমসনের সাথে কাজ করতে চাইতেন তিনি। থমসন তখন কেমব্রিজে, বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরির পরিচালক। বড় বড় বিজ্ঞানী কাজ করছেন তাঁর অধীনে। সে বছরই তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ পান বোর।

পাড়ি জমান কেমব্রিজে। সঙ্গে ছিল তাঁর থিসিস পেপার এবং থমসনের একটা বই। প্রথম পরিচয়েই সেই বইয়ে কিছু ভুল তুলে ধরেন বোর। থমসনের কাছে ভালো লাগেনি ব্যাপারটা।

বোর ছিলেন ধীর-চিন্তার মানুষ। কথা বলার আগে সময় নিয়ে চিন্তা করতেন। তাঁর সহকর্মী জেমস ফ্র্যাঙ্ক একবার বলেছিলেন, চিন্তা করার সময় বোরের মুখ শুকিয়ে যেত। তাঁকে অসহায় দেখাত। মনে হতো যেন তিনি অন্ধ। কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। জীবনের প্রতি তাঁর কোনো আসক্তি নেই, আনন্দ নেই। তারপর হঠাৎ করেই তাঁর মধ্যে জ্বলে উঠত আলো! বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ দেখা দিত চোখে-মুখে। বলে উঠতেন— হ্যাঁ, খুঁজে পেয়েছি!

শ্রোডিঙ্গার, ডি ব্রগলি এবং হাইজেনবার্গের মতো নিলস বোরও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে এগিয়ে নিয়েছেন। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের ক্লু বা সূত্র ব্যবহার করে আলোক-তড়িৎক্রিয়ার জট খুলেছিলেন ঠিকই। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনেক কিছুই মানতে নারাজ ছিলেন। সভা সম্মেলনে মাঝেমধ্যেই বোরের সাথে দেখা হতো আইনস্টাইনের। প্রায়ই বোরকে আটকাতে জটিল সব প্রশ্নের ফাঁদ পেতে আসতেন। বোর বিচলিত হননি কখনও। দু-একদিন সময় নিয়ে চিন্তা করতেন। বোরের প্রশ্নোত্তরে আইনস্টাইন খুব একটা তুষ্ট হতেন না।

এক বছর রাদারফোর্ডের সাথে কাজ করার পর জন্মভূমি ডেনমার্কে ফিরে আসেন বোর। পড়াতে শুরু করেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের নতুন এক ইনস্টিটিউটে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয় তাঁকে। বর্তমান নাম ‘নিলস বোর ইনস্টিটিউট’। সেখানে ইলেকট্রনের ধর্ম নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। বন্ধু হ্যানসেনের সহায়তায় পান বামারের সূত্রের হদিস। সেই সূত্রের সাহায্যে আরও ভালোভাবে সংশোধন করেন নিজের কোয়ান্টাম মডেল। কোপেনহেগেনে বসেই তিনি বিখ্যাত সম্পূরক নীতি প্রবর্তন করেন। যে নীতি খুব অদ্ভুত তথ্যের জন্ম দেয়। তত্ত্বটি হচ্ছে— কোয়ান্টাম কণিকার দুটো সম্পূরক বৈশিষ্ট্য একই সাথে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। একই সময়ে ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ মাপা যেমন অসম্ভব, তেমনি একই যন্ত্র দিয়ে দুটোকে মাপাও সম্ভব নয়।

১৯৩১ সাল। ডেনমার্কের সম্মানজনক একটি বাসভবনে থাকার আমন্ত্রণ পান তিনি। দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা মানুষগুলোকে সে বাড়িতে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। বোর দু বছর ছিলেন সে বাড়িতে। ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন আবিষ্কার করার পর বোর আবার নজর দেন নিউক্লিয়াসে। প্রবর্তন করেন নতুন এক তত্ত্ব। কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস থিওরি। এই তত্ত্ব অনুসারে, নিউট্রন দ্বারা কোনো নিউক্লিয়াসকে আঘাত করলে, সে নিউট্রনটি কেবল একটি নিউট্রনকে আঘাত করে না। বরং তা নিউক্লিয়াসে অবস্থিত নিউট্রন ও প্রোটনের সাথে ক্রমাগত সংঘর্ষে জড়ায়। সে সময় পরমাণু থেকে একটি শক্তি তরঙ্গ নির্গত হয়। সেটি হলো গামা রশ্মি।

৯৪৩ সালে দেশ ছাড়তে হয় বোর পরিবারকে। দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি। ডেনমার্ক চলে যায় নাৎসিদের দখলে। বোরের মা ছিলেন ইহুদি। প্রাণ বাঁচাতে নৌপথে সপরিবারে সুইডেন চলে যান তাঁরা। সুইডেন থেকে ইংল্যান্ড। এরপর পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা ছিলেন বোর। ইউরোপের বহু তরুণ শিক্ষার্থী কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভীড় জমিয়েছেন নিলস বোরের কাছ থেকে বিজ্ঞানের পাঠ নিতে। ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও ছিলেন তাঁদের একজন।

৭ অক্টোবর ১৮৮৫
কোপেনহেগেনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ক্রিশ্চিয়ান বোর, ড্যানিশ শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক এবং মা এলেন বোর, একজন ইহুদি।

১৯০৮
তরলের পৃষ্ঠচাপ সম্পর্কিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করে দ্য রয়্যাল ড্যানিশ একাডেমি অব সায়েন্স থেকে স্বর্ণপদক অর্জন করেন।

১৯১১
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯১১-১২
যুক্তরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সফরটি করেন। প্রথমে কেমব্রিজে যান। এরপর চলে আসেন ম্যানচেস্টারে। জন্ম দেন পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেল। 

নীলস বোরের নামে মৌলের নাম বোরিয়াম

পর্যায় সারণির ১০৭তম মৌলের নাম বোরিয়াম। মৌলটি তৈরি করার প্রথম দাবি জানান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা, সেই ১৯৭৬ সালে। পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটর বা কণাত্বরক যন্ত্রে বিসমাথ-২০৯ ও সীসা-২০৮ লক্ষ্য করে যথাক্রমে ক্রোমিয়াম-৫৪ ও ম্যাঙ্গানিজ-৫৫ ছুড়ে নতুন মৌলটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তাঁরা। সেগুলোর স্থিতিকাল ছিল খুব ক্ষণস্থায়ী। একটির অর্ধায়ু ছিল মাত্র দুই মিলিসেকেন্ড, অন্যটির মাত্র ৫ সেকেন্ড। তবে পরে প্রমাণ মিলল, সেগুলো আসলে পর্যায় সারণির ১০৭তম মৌল নয়।

১৯৮১ সালের দিকে জার্মানির একদল বিজ্ঞানী বিসমাথ-২০৯ নিউক্লিয়াসে ক্রোমিয়াম-৫৪ ছুড়ে আরেকটি মৌল আবিষ্কারের দাবি জানান। পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেল সেটি নতুন মৌল। এর অবস্থান পর্যায় সারণির ১০৭তম ঘরে।

ডেনমার্কের বিখ্যাত পদার্থবিদ নীলস বোরের নামে এ মৌলের নাম প্রস্তাব করা হয় নীলসবোরিয়াম। পরমাণুর কাঠামো এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এর স্বীকৃতি হিসেবে ১৯২২ সালে পেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার। যা-ই হোক, এর আগে ১০৫তম মৌলের নামও নীলসবোরিয়াম প্রস্তাব করেছিল রাশিয়া তথা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে সে নাম তখন নাকচ করা হয়েছিল। এবার ১০৭তম মৌলের নামের জন্য জার্মান বিজ্ঞানী দলের প্রস্তাব সমর্থন করলেন রুশ বিজ্ঞানীরাও। তবে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি (আইইউপিএসি) নীলসবোরিয়ামের বদলে বোরিয়াম নামটি স্বীকৃতি দেয়। তাদের মতে, এর আগে কোনো মৌলের নামকরণে কোনো বিজ্ঞানীর পুরো নাম ব্যবহৃত হয়নি, বরং নামের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। এই যুক্তিতে বোরিয়াম নামটিই বহাল থাকে।

মৃত্যু :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৪৫ সালে তিনি আবার কোপেনহেগেনে ফিরে যান। রয়েল একাডেমি অফ আর্ট অ্যান্ড সায়েন্সে তাঁকে আবার সম্পাদক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ইউরোপের দেশগুলির যৌথভাবে নিউক্লিয়ার গবেষণাগার সার্ন (CERN) তৈরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৫৭ সালে তিনি নর্ডিক ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স (Nordic Institute for Theoretical Physics)  এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। নিলস বোরের  ১৯৬২ সালে ১৮ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0