শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম-biography of sweden aslam

শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম

May 11, 2025 - 16:56
May 13, 2025 - 17:35
 0  1
শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম-biography of sweden aslam

কে এই সুইডেন আসলাম

নাম তার শেখ মো. আসলাম, কিন্তু পরিচিতি সুইডেন আসলাম নামে; শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসাবে পুলিশের খাতায় নামটি ছিল ওপরের দিকে; গ্রেপ্তার হয়ে ২৭ বছর কারাভোগের পর হলেন মুক্ত।

দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক রাজনীতিকের মুক্তির সঙ্গে বুধবার গাজীপুরের কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে সুইডেন আসলামের ছাড়া পাওয়ার খবরটিও এসেছে।

এই কারাগারের জেলার লুৎফর রহমানকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাত ৯টায় কারামুক্ত হন সুইডেন আসলাম। কারাফটকে অপেক্ষারত স্বজনদের সঙ্গে তিনি চলে যান।

অন্য সব মামলা নিষ্পত্তি হলেও যুবলীগের এক নেতা হত্যার মামলায় আটকে ছিলেন সুইডেন আসলাম। সেই মামলায় আদালত থেকে জামিন হওয়ার পর মুক্ত হলেন তিনি।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ঢাকার ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ সুইডেন আসলাম ছিল ব্যাপক উচ্চারিত একটি নাম। বেশ কয়েকটি খুনের আসামি ছিলেন তিনি।

যুবলীগের এক নেতাকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ১৯৯৭ সালে গ্রেপ্তার করা হয় সুইডেন আসলামকে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম: 

আসলামের অপরাধের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে আসলাম অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। ফার্মগেইটে ‘চাইনিজ’ নামের এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে বিবাদের পর আসলাম কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সালে তিনি কিশোর শাকিলকে হত্যা করেন, যা দিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শুরু।

১৯৯৭ সালে যুবলীগ নেতা গালিব হত্যার পর তিনি গ্রেফতার হন। তখন তার বয়স ছিল ৩৫ বছর। গ্রেফতার হওয়ার পরও আসলাম কারাগারে থেকে তার অপরাধ জগতের কার্যক্রম চালিয়ে যান। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তিনি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং মামলার সাক্ষীদের হুমকি দিতেন। তার বিরুদ্ধে মোট ২২টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি ছিল হত্যা মামলা। ২০০৪ সালে মামুন হত্যার বিচারে সুইডেন আসলাম খালাস পেয়ে যান, তবে তার অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কারাগারে থেকে যান।

উত্থানপর্ব

সুইডেন আসলামের পরিবারের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার আলগা ইউনিয়নের সাঁথিয়া গ্রামে। তবে তার বাবা শেখ জিন্নাত আলী পরিবার নিয়ে থাকতেন ঢাকার নগরীর ইন্দিরা রোডে। ফার্মগেইটে রড-সিমেন্টের দোকান ছিল জিন্নাত আলীর। তার তিন ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আসলাম দ্বিতীয়। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ফার্মগেইটে উঠতি রংবাজ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক, বর্তমানে দৈনিক আজকের পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কামরুল হাসান তার সংবাদপত্রে ২০২২ সালে লিখেছিলেন সুইডেন আসলামকে নিয়ে।

সেখানে বলা হয়েছিল, এইচ এম এরশাদের শাসনামলে আসলামের উত্থান পর্বের সূচনা হয়েছিল আজাদ ও বাপ্পী নামে দুই সহোদরকে পেটানোর মাধ্যমে। তখন ওই দুই ভাই ফার্মগেইট এলাকার অপরাধকর্মসহ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন।একদিন ফার্মগেইটের নিউ স্টার হোটেল থেকে বাপ্পীকে জোর করে তুলে নিয়ে যান আসলাম। এরপর পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখেন। তখন থেকে উত্থান হয় আসলামের।

সিমিকে কী জবাব দেবেন সুইডেন আসলাম

ব্যস্ত ফার্মগেটে হঠাৎ গুলির শব্দ। সুদর্শন এক তরুণ দুই হাত প্রসারিত করে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দুই হাতে দুটি অস্ত্র ধরা। সেই অস্ত্র দুটি থেকে খইয়ের মতো গুলি ফুটছে। বেপরোয়া তরুণের কাছে ঘেঁষার সাধ্য কারও নেই। গুলি থেকে বাঁচতে নিরাপদ স্থানে যেতে মরিয়া মানুষ।এই অবস্থায় পাল্টা গুলি চালালে প্রাণহানি অনিবার্য। দূরে দাঁড়ানো পুলিশের ছোট দলটির প্রধান পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে চুপ হয়ে গেলেন। আর সেই সুযোগে অস্ত্রধারী যুবকটি একটি মোটরবাইকেলের পেছনে উঠে চম্পট দেন।

এ ঘটনা আমাকে বলেছিলেন একসময়ের ডাকসাইটে পুলিশ কর্মকর্তা এসি আকরাম হোসেন। তবে সেই অভিযানে তিনি নিজে ছিলেন না, ছিলেন তাঁর টিমের এক পরিদর্শক। এরপর সেই তরুণ সন্ত্রাসীকে ধরতে প্রায় এক বছর ছক কষেছিলেন তিনি। ধরেছিলেন ১৯৯৭ সালে ২৬ মে বিকেলে পুরোনো ডিওএইচএসের বাসা থেকে। সেই বাসা চিনতেও ফ্রিজ বহন করা একটি ভ্যানের পিছু নিতে হয়েছিল পুলিশকে। নতুন কেনা ফ্রিজ সেই সন্ত্রাসীর বাসায় যাচ্ছে শুনেই ভ্যানের পিছু নিয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ।ক্রাইম রিপোর্টিংয়ের সুবাদে প্রায় প্রতিদিন বিকেলের দিকে দল বেঁধে আমরা যেতাম মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে।

সেখানে সহকারী পুলিশ সুপার পদের একজন কর্মকর্তা জনসংযোগের দায়িত্বে থাকতেন। তাঁর কক্ষে বসে দিনের বিভিন্ন ঘটনা শুনতাম। দরকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাও বলতাম। জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বসতেন ডিবি অফিসের ভেতরে একটি টিনশেডে। ডিবি অফিসের মূল ভবনের দোতলায় বসতেন দক্ষিণের ডিসি আর নিচতলায় ডিবির ডিসি। নিচের একটি বড় কক্ষের ভেতরে হার্ডবোর্ড দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ বানানো। এ রকম একটি কক্ষে বসতেন এসি আকরাম হোসেন। ’৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল খুনের ঘটনায় তাঁর কারাদণ্ড হয়। জেল থেকে বের হওয়ার পর গত বছরের ১৬ জুলাই তিনি মারা যান।

আসলাম এসএসসি পাস করেন তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল (বর্তমানে তেজগাঁও সরকারি বিদ্যালয়) থেকে। স্কুলজীবনে তিনি ভালো ফুটবল খেলতেন। আন্তজেলা স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। তেজগাঁও কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েই বনে যান উঠতি রংবাজ। সে সময় ফার্মগেট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন আজাদ-বাপ্পি নামে দুই ভাই। একদিন ফার্মগেটের নিউ স্টার হোটেল থেকে বাপ্পিকে জোর করে তুলে নিয়ে যান আসলাম ও তাঁর লোকজন। এরপর মারধর করে রাস্তায় ফেলে দেন। এতে দুই ভাইয়ের পতন ঘটে, উত্থান হয় আসলামের। শাকিল নামের এক কিশোর হত্যার মধ্য দিয়ে আসলামের এই কাজে হাতেখড়ি বলে অভিযোগ আছে। ১৯৮৭ সালে পূর্ব রাজাবাজার নাজনীন স্কুলের ভেতরে মায়ের সামনে খুন হয় শাকিল। তখন সুইডেন আসলামের সঙ্গে ছিলেন পূর্ব রাজাবাজারের সুমন ওরফে চাংখা সুমন, ব্যাটারি বাবু ওরফে কিলার বাবু, মণিপুরিপাড়ার বিআরটিসি কোয়ার্টারের আমজাদ হোসেন, পূর্ব রাজাবাজারের বাবু এবং কলাবাগানের সাবু।

ইতির সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর আসলাম তাঁর চাচা শেখ মো. আবদুল লতিফের মেয়ে সিমিকে বিয়ে করেন। সিমি এখন তাঁর ছোট বোন শ্যামলী আর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ইন্দিরা রোডের বাড়িতেই থাকেন। গত বৃহস্পতিবার তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন তরুণ রিপোর্টার শাহরিয়ার হাসান। কিন্তু স্বামী সম্পর্কে কোনো কথা বলতে চাননি সিমি। এত দিন পর এই পরিচয়ে তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে চান না, এই পরিচয়ও বহন করতে চান না। সারাক্ষণ থাকেন অজানা এক আশঙ্কায়।

সিমি এখন একাকী। তিনি বিশ্বাস করেন, বাকি জীবন আসলামকে জেলেই কাটাতে হবে। তাঁর সঙ্গে ছোট বোন শ্যামলীও বললেন, ‘মামলাগুলো যে অবস্থায় থাকুক না কেন, তিনি যে কখনো জেল থেকে বের হতে পারবেন, এটা আর আমাদের বিশ্বাস হয় না।’

সিমির কাছে প্রশ্ন ছিল, এমন একজন ভয়ংকর সন্ত্রাসীর সঙ্গে জীবন বেঁধে কী পেলেন, তাঁর হিসাব কষেছেন? সিমি কোনো জবাব দেন না, শূন্যের দিকে চেয়ে থাকেন, সেই প্রশ্নের জবাব হয়তো তাঁর নিজের কাছেও নেই। 

জামিনে মুক্তি পেলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম

কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, আসলাম ২০০৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পরবর্তীতে বিভিন্ন কারাগারে অবস্থান করেন। পরে ২০১৪ সাল থেকে তিনি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার হাজতি নম্বর ছিল- ৬৬৩/২০।

জেলার লুৎফর রহমান জানান, মঙ্গলবার তার জামিনের কাগজ কারাগারে এসে পৌঁছায়। পরে তা যাচাই-বাছাই শেষে রাতেই তাকে কারা মুক্তি দেওয়া হয়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0