ইউক্লিড এর জীবনী | Biography of Euclid
ইউক্লিড এর জীবনী | Biography of Euclid
ইউক্লিড – বিখ্যাত গণিতবিদ
|
জন্ম |
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি |
|---|---|
|
মৃত্যু |
খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীর মাঝামাঝি |
| পরিচিতির কারণ | ইউক্লিডীয় জ্যামিতি ইউক্লিড’স এলিমেন্টস ইউক্লিডীয় এলগরিদম ইউক্লিডের নামে নামকরণ করা জিনিসগুলির তালিকা |
|
বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন |
|
|
কর্মক্ষেত্র |
গণিত |
ইউক্লিড (জন্ম: অজানা - মৃত্যু: ৩০০ খ্রি. পূ.) বিখ্যাত গ্রিক গণিতজ্ঞ। তার লেখা গ্রন্থগুলির মধ্যে মাত্র তিনটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো : ডাটা, অপটিক্স ও এলিমেন্টস। এলিমেন্টস বইটি মোট ১৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। পাটিগণিতের মূল নিয়মাবলী, জ্যামিতি, গাণি[১] তিক রাশি ও গাণিতিক সংকেত, সংখ্যাতত্ত্বসহ গণিতের বিভিন্ন শাখায় তার অবদান রয়েছে। অমূলদ রাশির আবিষ্কার গ্রিক গণিতকে যে সংকটে ফেলেছিল তা থেকে উদ্ধার পেতে পাটিগণিত জ্যামিতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল আর ইউক্লিডের গণিতেরও অনেকটাকেই বলা যেতে পারে জ্যামিতিক বীজগণিত। তার প্রধান বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ ইউক্লিড’স এলিমেন্টস। এতে আলোচনা আছে তলমিতি ও ঘ্নমিতি এবং সংখ্যাতত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা যেমন অ্যালগরিদম নিয়ে।
ইউক্লিডের জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধ প্রণালী নিম্নোক্ত কয়েকটি মৌলিক প্রতীকির উপর নির্ভরশীল। সেগুলো হচ্ছে : বিন্দু, রেখা, তল, গতি এবং এই দুটি সম্পর্ক_"কোনো বিন্দু একটি তলের অন্তর্গত একটি রেখার উপর অবস্থিত" ও "যে কোনো বিন্দুর অবস্থান অন্য আর দুটি বিন্দুর মধ্যে"। আধুনিক পর্যালোচনা অনুসারে, ইউক্লিডের জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধগুলো এই পাঁচটি ভাগে বিভক্ত : আপত্ন, ক্রম, গতি, সন্ততি এবং সমান্তরাল স্বতঃসিদ্ধ। এই জ্যামিতি অসীম স্তরের উপাদানের কথাও বিবেচনা করেছে। এই প্রসঙ্গে ইউক্লিডিয়ান স্পেস ও ইউক্লিডিয়ান রিং-এর কথা উল্লেখ করা যায়।
সেই আদি যুগ থেকে শুরু করে ইউক্লিডের যুগ পর্যন্ত জ্যামিতিশাস্ত্রের একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়।
কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করতেন এই জ্যামিতিগ্রন্থ সংকলন ও সম্পাদনা করার জন্য মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটল তাঁকে নির্দেশ এবং অনুপ্রেরণা দান করেছিলেন। তাঁর আদেশেই ইউক্লিড এই জটিল কাজে হাত দেন এবং তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন। কিন্তু আধুনিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, কারো আদেশে নয়, ইউক্লিড তাঁর নিজের মনের অনুপ্রেরণাতেই বেছে নিয়েছিলেন এই বিশাল কর্মটি।
আজ এই গ্রন্থ বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রচারিত হয়েছে বিশ্বের প্রতিটি দেশে। পরবর্তীকালে বিশ্বের জ্ঞানী এবং পণ্ডিত ব্যক্তিরাও ইউক্লিডের জ্যামিতির সূত্র অবলম্বনেই তাঁদের গবেষণা করেছেন আবিষ্কার করেছেন অনেক বড় বড় বৈজ্ঞানিক সূত্র। ইউক্লিডের উপর গবেষণা করতে করতেই বিখ্যাত জার্মান অঙ্কশাস্ত্রবিদ রেইম্যান (Rieman) আবিষ্কার করেন ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি (Euclidian Geometry)।
মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনও ইউক্লিডের জ্যামিতির সূত্রের সাহায্যেই আবিষ্কার করেছেন তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব (Relativity)। এ ছাড়াও আইনস্টাইন ছিলেন ইউক্লিডের একান্ত ভক্ত এবং তাঁর ভাবশিষ্য। তিনি ইউক্লিডের উপর অনেক প্রবন্ধ রচনা করেছেন এবং গবেষণাও করেছেন। মহাজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতে ইউক্লিড ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অঙ্কশাস্ত্রবিদ। তিনিই জ্যামিতিশাস্ত্রের সত্যিকার সূত্র আবিষ্কার করে গেছেন।
ইউক্লিডের জ্যামিতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—কতকগুলো ব্যাপার বিনা প্রমাণে মেনে নিতে হবে। তাদের বলা হয় স্বতঃসিদ্ধ । অথাৎ এগুলো ধ্রুব সত্য। অঙ্ক দিয়ে এর কোনো প্রমাণ দেওয়া যাবে না, অর্থাৎ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। যেমন : ইউক্লিডের একটি সিদ্ধান্ত হলো---কোনো একটি সরল রেখার বহিঃস্থ কোনো বিন্দু থেকে একটিমাত্র সমান্তরাল সরলরেখা আঁকা যেতে পারে। ইউক্লিডে বলেন, z বিন্দুর ভেতর দিয়ে XY সরলরেখার সমান্তরাল একটিমাত্রই সরলরেখা আঁকা যায়। ইউক্লিড নিজেই এ ব্যাপারটির একটি যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ খাড়া করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি।
পরবর্তীকালে অন্যান্য গণিতজ্ঞেরাও অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁরাও ইউক্লিডের মতোই ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ইউক্লিডের সেই ধ্রুব সত্যগুলো ধ্রুবই রয়ে গেছে।
অঙ্কশাস্ত্র বিষয়টি সত্যি খুব কাঠখোট্টা। কিন্তু এমন নীরস বিষয়ের প্রতিই প্রচণ্ড আগ্রহ ছিলো ইউক্লিডের। তিনি যখন জ্যামিতিশাস্ত্র নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রন্থ রচনা এবং গবেষণায় রত ছিলেন, তখন সারা দেশ জুড়ে তার ছিলো প্রচণ্ড খ্যাতি। এমনকি স্বয়ং সম্রাট টলেমিও ছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ এবং অনুরাগী ভক্ত। তিনি নিজেও মাঝেমধ্যে ইউক্লিডের কাছে এই কাঠখোট্টা জ্যামিতি শিখতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু জ্যামিতির জটিল তত্ত্ব তাঁর মাথায় সহজে ঢুকতো না। তাই তিনি একদিন ইউক্লিডকে বলে ফেলেছিলেন, আচ্ছা, আপনার বইয়ে জ্যামিতির সূত্র যেভাবে লিখেছেন, এর চেয়ে সহজভাবে লিখবার বা বোঝবার কোনো পথ নেই? সম্রাটের প্রশ্ন শুনে মহাজ্ঞানী ইউক্লিড সবিনয়ে বলেছিলেন,-না, মহারাজ। রাজাদের জন্যও জ্যমিতিতে কোনো সহজ উপায় তৈরি হয়নি। জ্ঞানার্জনের জন্য রাজকীয় পথ বলে কিছু নেই।
এলিমেন্টস
যদিও এলিমেন্টস এর বহু কাজই পূর্বতন গণিতবিদরা সম্পন্ন করেছেন, তবুও ইউক্লিডের বিশেষত্ব ছিল এই কাজগুলো একত্রীকরণে। তিনি বিচ্ছিন্ন কাজগুলোকে জড়ো করে একক গ্রন্থে প্রাসঙ্গিকভাবে সাজিয়ে দেয়ায় যেকোনো কাজের তথ্যসূত্র উদ্ধৃতিকরণ সহজ হয়ে যায়। ২৩ শতাব্দী পরও তাই গাণিতিক প্রমাণগুলো যথাযথভাবে গণিতের ভিত্তি হয়ে রয়েছে।
এলিমেন্টস এর প্রথম দিকের প্রতিলিপিগুলোয় ইউক্লিডের নাম আসেনি, বরং অধিকাংশ প্রতিলিপিতে বলা হয়েছে সেগুলো "থিওনের সংস্করণ থেকে" অথবা "থিওনের বক্তৃতামালা"। ভ্যাটিকানে সংরক্ষিত যে প্রতিলিপিটিকে প্রাথমিক সময়ের প্রতিলিপি বলে ধরা হয় সেটায় কোনো লেখকের নাম উল্লেখ নেই। ইউক্লিড এলিমেন্টসের রচয়িতা বলে একমাত্র যে তথ্যসূত্রটি পাওয়া যায় তার নাম প্রোক্লুস, যিনি তার কমেন্টারি অন দ্যা এলিমেন্টস বইতে ইউক্লিডকে এর লেখক হিসেবে আরোপ করেছেন।
যদিও এলিমেন্টস এর জ্যামিতির জন্য সর্বাধিক পরিচিত, সংখ্যাতত্ত্বও এর অন্তর্গত যেখানে পারফেক্ট নাম্বার ও মার্জেন প্রাইমের মধ্যকার সম্পর্ক এবং গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক বের করার ইউক্লিডীয় এলগরিদম বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এলিমেন্টস এ বর্ণিত জ্যামিতিই ছিল জ্যামিতি বলতে যা বোঝায় তার সবকিছু। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে অ-ইউক্লিডীয় বা ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির আবির্ভাব হলে এলিমেন্টস এর জ্যামিতিজ্ঞানকে ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নামে আখ্যায়িত করা হয়।
বিখ্যাত গণিতবিদ
ইউক্লিড ছিলেন একজন বিখ্যাত হেলেনিস্টিক গণিতজ্ঞ। ইউক্লিডকে “ফাদার অফ জিওমেট্রি” ও বলা হয়। গণিতের বিভিন্ন শাখা যেমনঃ পাটিগণিতের মূল নিয়মাবলী, জ্যামিতি, গানিতিক রাশি ও গাণিতিক সংকেত, সংখ্যাতত্ত্বে তার অবদান রয়েছে। অমূলদ রাশির আবিষ্কার গ্রিক গণিতকে যে সংকটে ফেলেছিল তা থেকে উদ্ধার পেতে পাটিগণিত জ্যামিতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল আর ইউক্লিডের গণিতেরও অনেকটাকেই বলা যেতে পারে জ্যামিতিক বীজগণিত। তাঁর প্রধান বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ “ইউক্লিড’স এলিমেন্টস“। এতে আলোচনা আছে তলমিতি ও ঘ্নমিতি এবং সংখ্যাতত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা যেমন অ্যালগরিদম নিয়ে। ইউক্লিড রচিত “ইউক্লিড এলিমেন্টস” বইটি বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি, নিকোলাস কোপারনিকাস, জোহানেস কেপলার এবং বিশেষভাবে আইজাক নিউটন কে প্রবল্ভাবে প্রভাবিত করে। এবং তারা সবাই বইটি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান কে বিভিন্নভাবে কাজে লাগিয়াছেন।
“ইউক্লিড এলিমেন্টস” বইটি প্রায় ২০০০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে পাঠযোগ্য হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে। বইটি মূলত জ্যামিতি শাস্ত্রের বিভিন্ন স্বীকার্য নিয়ে কাজ করে। বইটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার মুল কারন হলো প্রতিটি তত্ত্ব নিয়ে সুস্পষ্ট লজিক বা যুক্তি বা বলা যায় ইউক্লিডের কাছে থাকা তার গানিতিক যুক্তিগত বিদ্যা। ইউক্লিড এলিমেন্টস বইটিতে ইউক্লিড কিছু অংশে জ্যামিতি কে সংখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। কারন হিসেবে ধারনা করা হত পাটিগণিত হ্মেত্রে তিনি খুব একটা উন্নতি করতে পারেন নি।
প্রকুলাস এর মতে ইউক্লিড এর জন্ম হওয়া উচিত ছিল টলেমির যুগে, কারন হিসেবে তিনি বলেছেনগ্রীক গণিতবিদ আর্কিমিডিসের কথা। তিনি বলতেন আর্কিমিডিসের ও আরো আগে ইউক্লিড গণিত বিষয়ে তার তত্ত্ব সমূহ উপস্থাপন করেন।
প্রকুলাস এই কথাটি আবার টলেমি কে বলেন , যখন টলেমি প্রকুলাস এর কাছে জানতে চেয়েছিল ইউক্লিড এলিমেন্টস ছাড়া জ্যামিতি শিখার আর কোন সহজ উপায় বা পদ্ধতি আছে কিনা?
ইউক্লিডের জন্ম, মৃত্যু সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি, শুধু জানা যায় তিনি মিশরের আলেকজান্ড্রিয়ায় বসবাস করতেন। তার রচিত তিনটি বই ইউক্লিড এলিমেন্টস, ইউক্লিডীয়ান জিওমেট্রি, ইউক্লিডিয়ান এলগরিদাম। ছাপাখান আবিষ্কারের পর সর্বপ্রথম মূদ্রিত হয়া বই এর মধ্যে ইউকিড এলিমেন্টস এর নাম অন্যতম। বইটি ১০০০ এর ও বেশি বার মুদ্রিত হয়েছে।
ইউক্লিড
ইউক্লিডের জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবু মনে করা হয় ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইউক্লিডের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু ঠিক কোথায় তাঁর জন্ম হয়, সে কথা আজও জানা যায়নি। তাঁর সময়ের বা তাঁর পরবর্তীকালের খুব কম বিজ্ঞানী বা গণিতবিদ তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন, একমাত্র আর্কিমিডিস ছাড়া। গ্রিক ভাষায় ‘ইউক্লিড’ নামের অর্থ হল সুবিখ্যাত। ইউক্লিডের মৃত্যুর আট শতাব্দী পরে ৪৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রোক্লাস সি নামের এক ব্যক্তি ইউক্লিডের জীবন বিষয়ে ‘কমেন্টারি অন দ্য এলিমেন্ট’ নামক একটি ইতিহাস গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্যের উল্লেখ করেন।
তবে আরবি লেখকদের বর্ণনায় তাঁর জন্ম হয়েছিল টায়ার শহরে। ধরে নেওয়া হয় যে তিনি যদি আলেকজান্দ্রিয়ার মানুষ হন, তাহলে সম্রাট আলেকজাণ্ডার এই শহর তৈরি করার প্রায় বছর দশেক পরে তিনি এখানে আসেন। সেদিক থেকে ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় এসেছিলেন বলে অনুমিত হয়। সেক্ষেত্রে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত সেরাপিয়াম, সুপ্রাচীন গ্রন্থাগারের কথাও সম্ভবত তিনি জানতেন। হয়তো বা এই গ্রন্থাগারে বসে তিনি পড়াশোনাও করে থাকবেন। এমনকি প্রোক্লাসের সেই লেখা থেকে জানা যায় যে, টলেমি ইউক্লিডকে নাকি প্রশ্ন করেছিলেন জ্যামিতি বোঝার কোনো দ্রুত উপায় আছে কিনা যার উত্তরে ইউক্লিড বলেছিলেন জ্যামিতি বুঝতে হলে রাজপথে আসা যাবে না।
যদিও এই ঘটনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ঐতিহাসিকেরা। প্রোক্লাসের মতে প্লেটোর ছাত্রদের থেকে ইউক্লিডের বয়স কম ছিল। প্লেটোর ছাত্র এক্সোডাসের বহু উপপাদ্যকে তিনি নিজে হাতে বিন্যস্ত করেছিলেন এবং থিয়েটেটাসের বহু কাজকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রামাণ্য করে তুলেছিলেন ইউক্লিড। আবার বয়সের দিক থেকে আর্কিমিডিস এবং ইরাটোস্থেনিসের তুলনায় বড়ো ছিলেন ইউক্লিড। ইরাটোস্থেনিসের কিছু কিছু লেখায় তাঁকে প্লেটোর মতবাদ ও দর্শনে বিশ্বাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক লেখক আবার মনে করেন যে ইউক্লিডের জন্ম হয়েছিল মেগারায়, কিন্তু সে তথ্য একেবারেই ভ্রান্ত।
ইউক্লিড কে ছিলেন বা তাঁর অস্তিত্ব ঠিক কোন সময়পর্বে ছিল এই প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিক ইটার্ড তিনটি সম্ভাবনার কথা বলেন। প্রথমত, হয়তো ইউক্লিড কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন যিনি ‘দ্য এলিমেন্টস’ নামে বিখ্যাত বইটি লেখেন। দ্বিতীয়ত, এমনও হতে পারে যে আলেকজান্দ্রিয়ায় কর্মরত একদল গণিতবিদের নেতা ছিলেন ইউক্লিড। তাঁরা সকলে মিলেই সম্ভবত ‘দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ ইউক্লিড’ বইটি লিখেছিলেন। ইউক্লিডের মৃত্যুর পরে তারাই হয়তো ইউক্লিডের নামে আরো বই লিখেছেন। সবশেষে তৃতীয় সম্ভাবনাটি হল, ইউক্লিড কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, কিন্তু মেগারার ইউক্লিড একজন ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন যার থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার ঐ গণিতবিদেরা ইউক্লিড নামে তাঁদের রচনা ও গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। এই তিনটি সম্ভাবনা নিয়েই ঐতিহাসিক মহলে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে ইউক্লিড আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত ‘অ্যাকাডেমি’র ছাত্র ও পরবর্তীকালে শিক্ষক ছিলেন। ফলে প্লেটোর সঙ্গে তাঁর সান্নিধ্য ঘটেছে একথা ধরে নেওয়া যায়। তাঁর ‘ডিডোমনা’ বইতে মোট ৯৫টি উপপাদ্যের উল্লেখ করেন যা সবই কতগুলি স্বতঃসিদ্ধের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
গণিত বিষয়ক গ্রন্থ ‘দ্য এলিমেন্টস’ই ছিল ইউক্লিডের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত একটি কাজ। এই বইয়ে আলোচিত বিষয়গুলি পরবর্তী প্রায় দুই হাজার বছর গণিতবিদ্যার জগতকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করেছিল। ১৪৮২ সালে ভেনিসে প্রথম লাতিন ভাষায় লেখা এই বইটি প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৫৭০ এর একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এই বইতেই প্রথম তিনি আয়তক্ষেত্র, রম্বস, রম্বয়েড ইত্যাদি সামতলিক চিত্রের সংজ্ঞা দেন। বইটি শুরুই হচ্ছে কিছু সংজ্ঞা এবং পাঁচটি অনুমান দিয়ে যাকে ‘পস্টুলেট’ (Postulate) বলা হয়।
প্রথম অনুমান হল, যে কোনো দুটি বিন্দুর মধ্যে একটি সরলরেখা অঙ্কন করা সম্ভব। এই অনুমানগুলিতে বিন্দু, রেখা, বৃত্ত ইত্যাদির অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে এগুলি থেকেই অন্যান্য সামতলিক জ্যামিতিক চিত্রের উৎপত্তি হবে একথা বলা হয়। চতুর্থ অনুমানে বলা হয় যে, সমস্ত সমকোণই সমান এবং সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চম অনুমানে ইউক্লিড বলেছেন যে অন্য একটি সরলরেখার সমান্তরালে কোনো বিন্দু থেকে কেবলমাত্র একটিই সরলরেখা অঙ্কন করা সম্ভব। এর মধ্যে দিয়েই ইউক্লীডিয় জ্যামিতির জন্ম হয়। উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত এই অনুমানগুলিকে মান্যতা দেওয়া হতো সমগ্র বিশ্বে এবং তার পরে নতুনভাবে ইউক্লিডের ধারণার বিপরীতে নতুন এক জ্যামিতি তৈরি হয়। এই রচনা আসলে ১৩টি ছোট ছোট খণ্ডে বিভাজিত।
প্রথম থেকে ষষ্ঠ খণ্ডের মূল আলোচ্য বিষয় সমতল জ্যামিতি। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের মূল বিষয় ত্রিভুজ, সমান্তরাল সরলরেখা, সামান্তরিক, আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র অঙ্কন ও তার বৈশিষ্ট্য এবং তৃতীয় খণ্ডে আলোচিত হয়েছে বৃত্তের ধর্ম বিষয়ে। পঞ্চম খণ্ডে অনুপাত, সমানুপাত নিয়ে আলোচনা করেছেন ইউক্লিড। এরপরে এই বইয়ের সপ্তম থেকে নবম খণ্ডে দেখা যায় সংখ্যাতত্ত্বের নানাবিধ আলোচনা। দুটি সংখ্যার গরিষ্ঠ গুণনীয়ক নির্ণয়ের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন এখানে ইউক্লিড। ‘এলিমেন্টস’-এর অষ্টম খণ্ডটি আবর্তিত হয়েছে জ্যামিতিক ক্রমকে কেন্দ্র করে এবং এর দশম খণ্ডের বিষয় হল অমূলদ সংখ্যা যা নিয়ে তাঁর আগে দার্শনিক থিয়েটেটাসও কিছু কাজ করেছিলেন। ইউডোক্সাসের প্রণীত অনুপাতের নতুন সংজ্ঞার সমর্থনে এই খণ্ডে ইউক্লিড কিছু কিছু উপপাদ্যের প্রামাণ্য অংশে বদল ঘটান।
সবশেষে বইয়ের একাদশ থেকে ত্রয়োদশ খণ্ডে ইউক্লিড ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির নানা বিষয় আলোচনা করেছেন। অষ্টতল্ক, ঘনক, গোলক বা পিরামিড ইত্যাদি ঘনবস্তুর বিষয়ে ইউক্লিডের আলোচনা ছিল অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠ। তবে একাদশ খণ্ডে তিনি মূলত পূর্বতন খণ্ডগুলির জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক কিছু সংজ্ঞা বিধৃত করেছেন। ৪৬৭টি প্রস্তাবনা যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। ইউক্লিডই প্রথম বলেছিলেন যে বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যা নির্ণয় করা একেবারেই অসম্ভব যা আজও সমানভাবে সত্য। স্কুল পাঠ্য জ্যামিতির ভিত্তি তৈরি করেছিল তাঁর এই ‘এলিমেন্টস’ বইটি।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর জ্যামিতি বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই আপেক্ষিকতা তত্ত্বে ইউক্লিডীয় জ্যামিতিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে জার্মান গণিতজ্ঞ রিম্যান ইউক্লিডের জ্যামিতিকে অগ্রাহ্য করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তোলেন অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি। আধুনিক জ্যামিতির বিভিন্ন প্রতর্কেও ইউক্লিডের বেশ কিছু ধারণাকে স্বীকার করা হয়নি।
‘দ্য এলিমেন্টস’ ছাড়াও আরো অনেকগুলি বই লিখেছিলেন ইউক্লিড যার মধ্যে অন্যতম হল ৯৪টি প্রস্তাবনা সম্বলিত ‘ডিডোমনা’ তথা ‘ডেটা’ শীর্ষক বইটি। এছাড়াও অন্যান্য বইগুলি হল – ‘অন ডিভিশনস’, ‘অপটিক্স’, ‘সারফেস লোকাই’ (Surface Loci), ‘পোরিজ্মস’ (Porisms), ‘দ্য বুক অফ ফ্যালাসিস’, ‘এলিমেন্টস অফ মিউজিক’, ‘কনিকস’ ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রথম দুটি বই ছাড়া আর কোনো বইই পাওয়া যায় না। তবে ইউক্লিডের পরবর্তীকালের বিভিন্ন গণিতবিদের লেখাপত্রে নানা অংশে এই বইগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। ইউক্লিডের ‘অপটিক্স’ বইটি ছিল গ্রিক ভাষায় লেখা প্রথম বই যেখানে পরিপ্রেক্ষিত (Perspective) বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তাছাড়া কীভাবে একটি সামতলিক চিত্রকে প্রদত্ত অনুপাত অনুযায়ী বিভাজিত করা যায় সে ব্যাপারে বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে ‘অন ডিভিশনস’ বইতে। তাঁর লেখা ‘পোরিজ্মস’ বইটিতে মোট ১৭১টি উপপাদ্য এবং ৩৮টি স্বতঃসিদ্ধের উল্লেখ করেছিলেন ইউক্লিড। ঐতিহাসিক প্রোক্লাসের লেখায় ইউক্লিডের ‘দ্য বুক অফ ফ্যালাসি’র উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাঁর স্মৃতিতে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি তাঁদের মহাকাশযানের নামকরণ করেছে ইউক্লিড স্পেসক্র্যাফট। এছাড়া মহাজগতে একটি তুচ্ছ ক্ষুদ্র গ্রহকে ইউক্লিডের সম্মানে ‘ইউক্লাইডস’ নামে ভূষিত করেছে নাসার বিজ্ঞানীরা।
মুত্যু:
আনুমানিক ২৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউক্লিডের মৃত্যু হয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0