লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি এর জীবনী | Biography of Leonardo Pisano Fibonacci
লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি এর জীবনী | Biography of Leonardo Pisano Fibonacci
প্রকৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ফিবোনাচ্চি ক্রম ও তার উদ্ভাবকের গল্প
|
জন্ম |
আনু. ১১৭০ পিসা, পিসা প্রজাতন্ত্র
|
|---|---|
|
মৃত্যু |
আনু. ১২৫০ (বয়স ৭৯–৮০) সম্ভবত পিসা প্রজাতন্ত্রের পিসা
|
|
পেশা |
গণিতবিদ |
|
পরিচিতির কারণ |
|
|
পিতা-মাতা |
উইলিয়াম "বোনাচ্চি" (পিতা) |
ইতিহাস
গুগলিয়েলমো নামে এক ইতালীয় বণিক এবং শুল্ক কর্মকর্তা ছিলেন। গুগলিয়েলমো আলজেরিয়ার বুগিয়ায় একটি ট্রেডিং পোস্ট পরিচালনা করতেন। ফিবোনাচ্চি বালক বয়সে তাঁর সাথে বুগিয়ায় ভ্রমণ করেছিলেন এবং তিনি হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।
ফিবোনাচ্চি ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের আশেপাশে ভ্রমণ করেছিলেন, অনেক ব্যবসায়ীদের সাথে দেখা করেছিলেন এবং তাদের পাটিগণিত করার পদ্ধতি সম্পর্কে শিখতেন। তিনি শীঘ্রই হিন্দু-আরবি পদ্ধতির অনেক সুবিধা উপলব্ধি করেছিলেন, যা সেই সময়ে ব্যবহৃত রোমান সংখ্যার মতো নয়, একটি স্থান-মান ব্যবস্থা ব্যবহার করে সহজ গণনার অনুমতি দিয়েছিল। ১২০২ সালে, তিনি লিবার আবাসি ( অ্যাবাকাসের বই বা গণনার বই ) সম্পূর্ণ করেছিলেন, যা ইউরোপের হিন্দু-আরবি সংখ্যাগুলিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
ফিবোনাচ্চি সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের অতিথি হয়েছিলেন, যিনি গণিত এবং বিজ্ঞান উপভোগ করেছিলেন। ১২৪০ সালে, পিসা প্রজতন্ত্র ফিবোনাচ্চিকে (লেওনার্দো বিগ্লো বলে পরিচিত) একটি ডিক্রি দিয়ে বেতন প্রদান করে সম্মানিত করেছিলেন যা তাকে নগরীতে অ্যাকাউন্টিং এবং নির্দেশনা বিষয়ে পরামর্শদাতা হিসাবে শহরকে যে সেবা দিয়েছিল তার স্বীকৃতিস্বরুপ।
ফিবোনাকির মৃত্যুর তারিখটি জানা যায় নি, তবে এটি ১২৪০ এবং ১২৫০ এর মধ্যে অনুমান করা হয়,সম্ভবত পিসায়।
মনে করুন, একটি ঘরে এক জোড়া খরগোশ আছে। এই খরগোশ জোড়া প্রতি মাসে নতুন এক জোড়া খরগোশের জন্ম দিতে পারে। নতুন জন্ম নেয়া প্রতি জোড়া খরগোশই আবার জন্মের দ্বিতীয় মাস থেকে এক জোড়া করে খরগোশের জন্ম দেয়। তাহলে বলুন দেখি, এরূপ বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বছর শেষে কত জোড়া খরগোশ জন্ম নেবে? মাথা চুলকে লাভ নেই, অত গভীর চিন্তাভাবনারও দরকার নেই। এই জটিল হিসেবের সহজ সমাধান হচ্ছে ‘ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স’ বা ফিবোনাচ্চি ক্রম।
ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ক্রমে, পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যাকে যোগ করে পরবর্তী সংখ্যা পাওয়া যায়। গণিতে এই সংখ্যাক্রমের বিবিধ ব্যবহার তো রয়েছেই, পাশাপাশি প্রকৃতিতে ফিবোনাচ্চি ক্রম বিরাজ করছে বিস্ময়করভাবে। সূর্যমুখী ফুল, পাইনশঙ্কুর মঞ্জরি কিংবা আনারসের শল্কতে খুঁজে পাওয়া যায় ফিবোনাচ্চি ক্রম। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, গোল্ডেন রেশিওর (গোল্ডেন রেশিওর মান = ১.৬১৮০৩৩…, যা ফাই φ চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয়) সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে এই ফিবোনাচ্চি ক্রমের। গোল্ডেন রেশিও কী সেটা জানেন তো?
একটি সরলরেখাকে এমনভাবে ভাগ করুন যেন, এক অংশের চেয়ে আরেক অংশের দৈর্ঘ্য বড় হয়। এবং বড় অংশকে ছোট অংশ দ্বারা ভাগ করলে যে অনুপাত পাওয়া যাবে, পুরো সরলরেখার দৈর্ঘ্যকে বড় অংশের দৈর্ঘ্য দ্বারা ভাগ করলেও একই অনুপাত পাওয়া যাবে! এই বিস্ময়কর অনুপাতটিই হচ্ছে গোল্ডেন রেশিও। মজার ব্যাপার হলো, ফিবোনাচ্চি ক্রমের পাশাপাশি দুটি সংখ্যার বড়টিকে ছোটটি দ্বারা ভাগ করলে যে অনুপাত পাওয়া যায়, তা গোল্ডেন রেশিওর খুব কাছাকাছি। বিষয়টি আরো মজাদার হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় যে, ক্রমের যত বড় সংখ্যার অনুপাত নির্ণয় করা যায়, অনুপাত ততই গোল্ডেন রেশিওর দিকে এগোয়!
এই বিস্ময়কর সংখ্যাক্রম আবিষ্কার করেছেন যিনি, তার নাম ফিবোনাচ্চি। তাকে নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। মধ্যযুগে, ১১৭০-১১৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইতালির পিসা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে যা জানলে আপনি অবাক হবেন, তা হলো এই যে, ফিবোনাচ্চির নাম আসলে ফিবোনাচ্চিই নয়! তার বাবা গুগলিয়েলমো বোনাচ্চি তার নাম রেখেছিলেন লিওনার্দো বোনাচ্চি। তিনি জীবিত থাকতেই পরিচিত হন ‘লিওনার্দো অব পিসা’ নামে। ফিবোনাচ্চির উৎপত্তি কীভাবে এবং কখন হয়েছিল তা জানা যায় না। অন্তত, তিনি জীবিত থাকতে তাকে কেউ ‘ফিবোনাচ্চি’ বলে ডাকেনি! তথাপি, আধুনিককালে তিনি ফিবোনাচ্চি নামেই সমধিক পরিচিত।
ভূমধ্যসাগরীয় বুজিয়া শহরে পড়ালেখা করেন ফিবোনাচ্চি। বাল্যকালেই গণিতের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সংখ্যা নিয়ে খেলতে অসম্ভব ভালোবাসতেন তিনি। তিনি পুলকিত হয়েছিলেন যখন জানতে পারেন যে, আরব গণিতবিদরা ঝামেলাপূর্ণ রোমান সংখ্যা ব্যবহার করে না। রোমান সংখ্যায় শূন্যের অনুপস্থিতি এবং বড় সংখ্যা লেখার জন্য অধিক পরিমাণ অঙ্ক ব্যবহার করতে হতো বলে, বড় গুণ-ভাগের হিসাবে জটিলতা সৃষ্টি হতো। আর গ্রিকদের ক্ষেত্রে তো তা আরো জটিল। গ্রিক গণিত বেশ উন্নত হলেও তা একটা নির্দিষ্ট জায়াগায় আটকে ছিল এর সংখ্যা পদ্ধতির জন্যই। কারণ, গ্রিক সংখ্যা গ্রিক বর্ণমালা দ্বারাই লেখা হতো। ভাবুন তো একবার, ৫ × ৬ = ৩০, এই সহজ হিসাবটাকে যখন ঙ × চ (ঙ বর্ণমালার পঞ্চম বর্ণ এবং চ ষষ্ঠ বর্ণ) আকারে লেখা হবে তখন উত্তর কি দেবেন?
বুজিয়াতে ফিবোনাচ্চি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন, আরবরা যে সংখ্যাপদ্ধতি ব্যবহার করে, তা গ্রিক বা রোমানদের চেয়ে বেশ উন্নত। তিনি নতুন সংখ্যাপদ্ধতির মাঝে ডুব দিলেন এবং আরো বিস্তারিত জানতে শুরু করলেন দীর্ঘ এক ভ্রমণ। মিশর থেকে শুরু করে গ্রিস, সিসিলি, ফ্রান্স হয়ে সিরিয়ায় শেষ হয় তার এই ভ্রমণ। ভারতবর্ষে না গিয়েও, সিরিয়াতেই তিনি খোঁজ পান ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতির। ০-৯ পর্যন্ত অঙ্কবিশিষ্ট এই সংখ্যাপদ্ধতির প্রেমে পড়ে যান ফিবোনাচ্চি। এই সংখ্যাপদ্ধতিকে তিনি ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপে নিয়ে আসেন। তিনিই প্রথম ইউরোপে, ঝামেলাপূর্ণ রোমান সংখ্যাপদ্ধতি, আধুনিক সংখ্যাপদ্ধতি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেন। “আমি এই বইয়ের তথ্যগুলো জড়ো করেছি ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতি এবং ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সাথে যথাসম্ভব আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা যোগ করে।”– নিজের বই ‘দ্য বুক অব ক্যালকুলেশন’ সম্বন্ধে ফিবোনাচ্চি
১২০২ সালে ফিবোনাচ্চি তার অসাধারণ কাজ ‘লাইবার অ্যাবাচি’ বা ‘দ্য বুক অব ক্যালকুলেশন’ প্রকাশ করেন। ১২২৮ সালে তিনি এই বইয়ের পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। বইটি প্রকাশের সাথে সাথেই পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই বইয়ের মাধ্যমেই পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতির পরিচয় করিয়ে দেন ফিবোনাচ্চি। তিনি বইয়ে যথার্থ যুক্তি সহকারে ব্যাখ্যা করেন যে, ইউরোপীয়রা যদি রোমান সংখ্যাপদ্ধতির সাথে লেগে থাকে তাহলে গণিত কোনোদিনই এগোতে পারবে না। এই বইয়ে তিনি দেখান, কীভাবে গণিত, বাণিজ্যিক হিসাব, অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলো নতুন সংখ্যাপদ্ধতি দিয়ে সহজে সমাধান করা সম্ভব।
জর্ডানাস নামক এক বিখ্যাত গণিতবিদের সমসাময়িক হলেও ফিবোনাচ্চি অনেক বেশি প্রতিভাবান এবং পরিশীলিত গণিতজ্ঞ ছিলেন। বিমূর্ত উপপাদ্যের পরিবর্তে তার ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকটিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবার জন্যই তিনি তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে বিখ্যাত হয়েছিলেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে যেসব জ্ঞানার্জন করেছিলেন তিনি সেগুলির ওপর ভিত্তি করেই ১২০২ সালে লিবার অ্যাবাসি গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। এই বইয়ের নামের অর্থ হল ‘বুক অব অ্যাবাকাস’ বা গণনার বই। এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি ইউরোপকে হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
এই গ্রন্থের সাহায্যেই ল্যাটিন-ভাষী বিশ্বকে দশমিক পদ্ধতির পাঠ দেন ফিবোনাচ্চি। সেই সময় ইতালি ছোট ছোট স্বাধীন শহর ও অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল, ফলে অনেক ধরনের ওজন এবং টাকাকড়ি লেনদের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ফিবোনাচ্চি এইসব বণিকদের জন্য লিবার অ্যাবাসি রচনা করেছিলেন। তারমধ্যে ব্যবহারিক সমস্যার নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরে, কাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে জটিল রোমান সংখ্যার তুলনায় এই গ্রন্থে উল্লিখিত সংখ্যা পদ্ধতির সাহায্যে কত সহজে বাণিজ্যিক এবং গাণিতিক গণনা করা যেতে পারে। দশমিক সংখ্যার বিস্তারের সূচনা হিসাবে ফিবোনাচ্চির এই বইটি ছিল তার সবচেয়ে বড় গাণিতিক কৃতিত্ব।
এই গ্রন্থের ভিতরেই ফিবোনাচ্চি ক্রমের উল্লেখ রয়েছে। এই বইতে ফিবোনাচ্চি যে গাণিতিক সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল আদর্শ পরিস্থিতিতে খরগোশ কত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এই ফিবোনাচ্চি ক্রম অনুসারে প্রতিটি সংখ্যা পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার সমষ্টি। এই ক্রমটি ভারতীয় গণিতবিদরা ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে বর্ণনা করেছিলেন। এই ফিবোনাচ্চি সিরিজ বা অনুক্রমের প্রতিটি সংখ্যা F n হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এই ক্রমের প্রথম সংখ্যাটি হয় শূণ্য এবং দ্বিতীয়টি ১।
এই ক্রমে সংখ্যাগুলি যেভাবে বেড়ে যায় পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফল অনুযায়ী, সেই হিসেবে বর্গক্ষেত্রের একটি প্যাটার্ন তৈরি করে তাতে রেখাঙ্কন করলে একটি সর্পিল আকার পাওয়া যায়, যা ‘গোল্ডেন স্পাইরাল’ নামেও পরিচিত। এই ফিবোনাচ্চি ক্রমের সর্পিল প্যাটার্ন প্রাকৃতিক বিভিন্ন জিনিসে, যেমন, সূর্যমুখীর মাঝখানের বীজ, শামুখের খোলস, শঙ্খ ইত্যাদিতেও দেখতে পাওয়া যায়।
১.৬১৮-এর যে গোল্ডেন রেশিও, যা-কিনা গণিতবিদ, বিজ্ঞানী এবং প্রকৃতিবিদদের কাছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে, সেই সোনালি অনুপাত ফিবোনাচ্চি ক্রম থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল। ক্রমানুসারে ফিবোনাচ্চি সংখ্যার প্রতিটি জোড়ার ভাগফল আনুমানিক ১.৬১৮ বা ০.৬১৮। এই লিবার অ্যাবাসি বইটি যেমন ব্যবসায়িক গণনাকে সহজ এবং দ্রুততর করেছিল, তেমনি ইউরোপে ব্যঙ্কিং ও অ্যাকাউন্টিংয়ের বৃদ্ধিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এই গ্রন্থে অমূলদ সংখ্যা এবং মৌলিক সংখ্যা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
মৃত্যু :
তিনি কবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তা-ও সুনিশ্চিতভাবে জানা নেই আমাদের। আমরা শুধু এতটুকুই জানি যে, এই মহান গণিতবিদ ১২৪০ খ্রিস্টাব্দেও জীবিত ছিলেন। তারপর তার সম্পর্কিত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সেজন্য ধরে নেয়া হয়েছে, ১২৪০ খ্রিস্টাব্দেই তার জীবনাবসান হয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0