বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর জীবনী | Biography of Benjamin Franklin
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর জীবনী | Biography of Benjamin Franklin
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের অজানা কথা
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন:
(১৭ জানুয়ারি ১৭০৬ - ১৭ এপ্রিল, ১৭৯০)[১] আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে একজন। তিনি বিবিধ বিষয়ে দক্ষ ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিন একাধারে একজন লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্ভাবক, রাষ্ট্রপ্রধান, কৌতুকবিদ, গণআন্দোলনকারী এবং কূটনীতিক। বিজ্ঞান বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তার অবদানসমূহ বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তড়িৎ সংক্রান্ত বিবিধ বিষয়ে তার অবদান রাখেন। তিনি বজ্রনিরোধক দন্ড, বাইফোকাল লেন্স, ফ্রাঙ্কলিনের চুলা, অডোমিটার, ফ্রাঙ্কলিন হারমোনিকা ইত্যাদি উদ্ভাবন করেন।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ম্যাসাচুসেটস বের, বস্টনে জন্ম নেন। তিনি দাদা জেমসের সাথে লন্ডনে New England Quralt পত্রিকা চালাতেন। পরে ফিলাদেলফিয়া পালিয়ে যান। ১৭৩০ সালে Pensilvaniya Gazzette পত্রিকা বার করতেন ও ডবেরা নামে এক বিদুষী মহিলাকে বিয়ে করেন। তিনি ১৭৩১ সালে সালে ফিলাদেলফিয়া পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৩২ সালে পুওর রিচারড আলামানক চালু করেন। ১৭৪৭ সালে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বিদ্যুৎ মতবাদ প্রচার করেন। যা উচ্চপ্রশংসিত হয়। ১৭৯০ সালের ১৭ই এপ্রিল তিনি মারা যান।
| জন্ম | ৬ই জানুয়ারি, ১৭০৬ বস্টন, ম্যাসাচুসেটস বে
|
|---|---|
| মৃত্যু | ১৭ই এপ্রিল, ১৭৯০ ফিলাদেলফিয়া, পেনসিলভ্যানিয়া
|
|
জাতীয়তা |
আমেরিকান |
|
পরিচিতির কারণ |
বিজ্ঞানী, লেখক এবং রাজনীতিবিদ |
|
স্বাক্ষর |
|
ফ্রাঙ্কলিনের অজানা কথা
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে পৃথিবীর সবাই চেনে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ ডলারের কাগজের মুদ্রায় যে তাঁর ছবি দেখা যায়। তাঁর জীবন, তাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর কর্মজীবন, তাঁর রাজনৈতিক জীবন, তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পড়াশোনা ও গবেষণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে জন্ম নেওয়া একজন তরুণ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাউন্ডিং ফাদার’দের একজন হয়ে উঠলেন, তা নিয়ে সবার আগ্রহ আছে। জর্জ ওয়াশিংটন যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তেমনি বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইউরোপে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
বেনঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন নামটি যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই জনপ্রিয় যে পরবর্তী সময়ে দুজন মার্কিন রাষ্ট্রপতির নাম তাঁর অনুসরণে ছিল—ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্স।
আমরা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে বাংলাদেশে চিনি বিজ্ঞানী হিসেবে! যুক্তরাষ্ট্রের স্রষ্টাদের একজন হিসেবে যত না চিনি, তার চেয়ে বেশি চিনি অন্য রকম একটা গল্পের মাধ্যমে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বজ্রপাত নিয়ে কাজ করেছিলেন। ঘুড়ি উড়িয়ে সুতা দিয়ে তিনি বজ্রপাত যে বিদ্যুৎ তা প্রমাণ করেন। সেই যে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, সেটা আমাদের এখানে খুব জনপ্রিয় একটা লোকগাথা হিসেবে আছে বলা যায়। সেই পাগলামির জন্য পরবর্তী সময়ে উঁচু ভবন রক্ষায় লাইটেনিং রড তৈরি করে ৪৬ বছর বয়সে পৃথিবীর ইতিহাসে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তাঁর জায়গা করে নেন।
সবাইকে নিয়ে এগিয়ে আসা
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বেড়ে ওঠা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তিনি প্রচণ্ড মাত্রায় সামাজিক একজন মানুষ ছিলেন। তিনি খুবই হতদরিদ্র অবস্থায় ফিলাডেলফিয়ায় আসেন এবং ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি তৈরি করেন। প্রথমে তিনি একটি ছাপখানায় কাজ নেন। পরবর্তী সময়ে ছাপাখানার মালিক হন। একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ শাসন চলছিল ও ব্রিটিশ পোস্ট অফিসে কাজের জন্য তাঁর পত্রিকা অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান। ব্রিটিশ শাসকেরা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে পছন্দ করতেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
লেখা যখন শক্তি
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন লেখক হিসেবেও বেশ বিখ্যাত ছিলেন। তার চরিত্রগঠনের ১৩টি গুণ নিয়ে লেখার কথা সবাই জানে। পুওর রিচার্ডস অ্যালামনাক সিরিজ প্রকাশের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বেঞ্জামিন ছদ্মনামে অনেক লেখা লিখেছেন। এমনকি তাঁর ভাইয়ের পত্রিকাতেও তিনি ছদ্মনামে লিখতেন। প্রচুর বই পড়তেন তিনি। মানুষকে অনেক চিঠি লিখতেন তিনি। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ৮০ বছরের জীবনে অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলা যায়। প্রথমে পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক, তিনি একাধারে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সমাজ সংস্কারক হিসেবে তার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।
বহুমুখী প্রতিভাধর ফার্স্ট আমেরিকানের কথা
একজন ব্যক্তির পক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটেছে যারা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম। এমনই একজন মানুষ ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তিনি কী ছিলেন- এ প্রশ্ন না করে বরং তিনি কী ছিলেন না, এই প্রশ্ন করাটাই তার জন্য উপযুক্ত! তিনি একাধারে লেখক, গবেষক, দার্শনিক, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, মুদ্রাকর, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, প্রকাশক, রাজনীতিবিদ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
আমেরিকার জাতির পিতাদের অন্যতম একজন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তিনি আমেরিকার সংবিধান রচয়িতাদেরও একজন ছিলেন। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি ব্রিটেন থেকে আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের মূল চারটি ডকুমেন্টেই স্বাক্ষর করেন; আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (১৭৭৬), ফ্রান্সের সাথে মৈত্রীচুক্তি (১৭৭৮), প্যারিস চুক্তি (১৭৮৩) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান (১৭৮৭)।
এই বহুমুখী প্রতিভার ব্যক্তিত্বের জন্ম ১৭০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন শহরে। তিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জশিয়াহ একটি সাবান তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তার বাবা জশিয়াহ ফ্রাঙ্কলিনের ১৭ জন সন্তানের মধ্যে ১৫ তম ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিনের মা আবিয়াহ ফলগার ছিলেন তার পিতার দ্বিতীয় স্ত্রী। বেঞ্জামিনের পিতা অতি কষ্টে বিরাট এই সংসার চালাতেন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন মাত্র দুই বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেছিলেন।
যখন তার আট বছর বয়স তখন তার বাবা তাকে একটি গ্রামার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু দুই বছর পর যখন তার বয়স দশ তখন অর্থের অভাবে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন বন্ধ হয়ে যায়। পিতা জশিয়াহ বেঞ্জামিনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে তার সাবান তৈরির কারখানায় ঢুকিয়ে দিলেন ।
স্কুল জীবন থেকেই বেঞ্জামিন নাবিক হতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার বাবা চাইতেন না বেঞ্জামিন নাবিক হোক। কারণ, তার বড় পুত্র সমুদ্রে গিয়ে আর ফেরেনি। সাবানের কারখানায় বেঞ্জামিনের মন নেই দেখে তার পিতা অন্য কোনো কাজে দেওয়ার কথা ভাবেন। বোস্টন শহরে বেঞ্জামিনের বড় ভাইয়ের একটি ছাপাখানা ছিল। বেঞ্জামিনকে সেই ছাপাখানায় দেওয়ার কথা ভাবলেন তার পিতা। তখন তিনি বারো বছরের কিশোর।
কয়েক বছর ভাইয়ের সাথে ছাপাখানায় কাজ করার পর যখন তার বয়স সতের, বেঞ্জামিন ঠিক করলেন ফিলাডেলফিয়া শহরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ছাপাখানার ব্যবসা শুরু করবেন। বেঞ্জামিন নিউইয়র্ক ঘুরে ফিলাডেলফিয়া এসে পৌঁছলেন। ফিলাডেলফিয়া শহরে তিনি একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এই সময় তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা খুব বেশি না হলেও বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। মাঝে মাঝে সমস্ত রাত কেটে যেত বই পড়তে পড়তে।
১৭২৪ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ হলো। লন্ডনেও একটি বড় ছাপাখানায় কাজ পেলেন। দুই বছর তিনি লন্ডনে ছিলেন। এরপর ১৭২৬ সালে লন্ডন থেকে ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে এলেন। অল্পদিনের মধ্যেই গড়ে তুললেন এক বিরাট ছাপাখানা। কঠোর পরিশ্রম আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ব্যবসায় সফলতা পান। প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে শুরু করলেন।
লন্ডন যাওয়ার পূর্বে ফিলাডেলফিয়া শহরে মিস রিডের সঙ্গে দেখা হয়েছিল বেঞ্জামিনের। অল্পদিনেই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হতে বেশি দিন লাগেনি ।
বেঞ্জামিন লন্ডনে থাকাকালীন মিস রিডকে তিনি ফিলাডেলফিয়ায় ফিরবেন না বলে চিঠি লিখেন। এ সময় মিস রিড তার মায়ের ইচ্ছায় জন রজার্স নামে একজন ব্রিটিশ পুরুষকে বিয়ে করেন। কিন্তু কিছুদিন পর রিড জানতে পারেন ইংল্যান্ডেও রজার্সের একজন স্ত্রী রয়েছে। এই সংবাদ পেয়ে রিড রজার্সের সাথে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। কিছুদিন পর বেঞ্জামিন ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে আসেন। সেই সময় রিডের সাথে বেঞ্জামিনের পুনরায় দেখা হয়। আবারও দুজনের মধ্যে প্রেম হয়। উভয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই সময়ের পেনসিলভানিয়ার আইনে স্বামীর মৃত্যুর আগে পুনরায় বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল। তাই বেঞ্জামিনের সাথে রিডের বিবাহ বৈধ ছিল না।
১৭২৭ সালে রজার্স ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে চলে যান। সেখানে একটি যুদ্ধে রজার্সের মৃত্যু হয়। কিন্তু রজার্সের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ না থাকায় বেঞ্জামিনকে বিয়ে করা অবৈধ ছিল। তাই ১৭৩০ সালে তারা তাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের উপস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক বিয়ে করে একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এই মিলন উভয়ের জীবনে সুখ আর শান্তি এনে দিয়েছিল। ১৭৭৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত রিড বেঞ্জামিনের সঙ্গী ছিলেন।
বেঞ্জামিন ক্রমেই ধনী ও খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে ফিলাডেলফিয়া শহরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ক্রমশ সমাজ সংস্কারমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে থাকেন। ১৭৩০ সাল থেকে শুরু করে ফিলাডেলফিয়া শহরে তিনি অনেক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সময় তিনি ফিলাডেলফিয়ায় জুন্টো নামের একটি সংস্থা স্থাপন করেন। সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উন্নতিতে পারষ্পরিক সহযোগিতা করা। এই সংস্থার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সমাজ সংস্কারমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।
সে সময় দেশে উপযুক্ত গ্রন্থাগারের অভাব ছিল। অধিকাংশ মানুষই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বই কিনে পড়ার মতো সামর্থ্যবান ছিল না। সেই সময় আমেরিকায় বই সহজলভ্য ছিল না । ১৭৩১ সালে তিনি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি স্থাপন করলেন। আমেরিকায় এইরকম লাইব্রেরি এই প্রথম। অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই লাইব্রেরি। এর জনপ্রিয়তা দেখে আরও অনেক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। একসময় তিনি স্থাপন করলেন আমেরিকার প্রথম বীমা কোম্পানি, এর কাজ ছিল আগুনে পুড়ে যাওয়া সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
অজানা বেঞ্জামিন
বাহিত ভদ্রলোকের নাম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। নামটা চেনা চেনা লাগতেই পারে। কেননা, তাঁর নামের আগে বিজ্ঞানী উপাধিটি বসানো হয়। তিনি বিজ্ঞানী। আবিষ্কারকও বটে। বিসিএস পরীক্ষায় প্রশ্নটা যদি এমন আসে, কে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, তবে উত্তরটা দিতে কষ্ট হবে। তিনি আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন। তিনি লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, সংগীতজ্ঞ, রাষ্ট্রপ্রধান, কৌতুকবিদ, গণ-আন্দোলনকারী, কূটনীতিক। উইকিপিডিয়া ফ্রিতে তথ্য দিয়ে সাহায্য করল বলে কলার উঁচিয়ে বলতে পারলাম, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কী ছিলেন না! সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলার অসাধারণ সাধনার পথিকৃৎ তিনি।
বিসিএস পরীক্ষায় বরং প্রশ্নটা এমন হলে সুবিধা। বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছিলেন কে? উত্তরটা অবশ্যই বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। ধনাত্মক আর ঋণাত্মক, অর্থাৎ পজিটিভ চার্জযুক্ত বিদ্যুৎ এবং নেগেটিভ চার্জযুক্ত বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। আকাশে চমকানো বিদ্যুৎ রেশমি কাপড়ের তৈরি ঘুড়ির রেশমি সুতোয় ধাতব চাবি বেঁধে দিয়ে টেনে আনলেন হাতের মুঠোয়। আজ তা আমাদের ঘরে ঘরে। এ-ই শেষ নয়। তিনি বজ্রনিরোধক দণ্ড, বাইফোকাল লেন্স, অডোমিটার, বিশেষ চুলা (ফ্রাঙ্কলিনের চুলা) আর বিশেষ হারমোনিকা (ফ্রাঙ্কলিনের হারমোনিকা) আবিষ্কার করেছিলেন, যা এত বছর পরও ব্যবহার করছে মানুষ। বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি সার্থক। ইতিহাস তাঁর সার্থকতা স্বীকার করে নিয়েছে।
তবে সব ফেলে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ভদ্রলোককে বিবাহিত বলার কারণটা কী? শিরোনাম দেখেও বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না, বিয়েবিষয়ক ঝামেলায় পড়েছিলেন বেচারা। সত্যিই পড়েছিলেন।
এখন থেকে ৩১১ বছর আগেকার মানুষ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭৩০ সালে বিয়ে করেছিলেন ডেবোরাহ রিডকে। কিন্তু প্রায় দুই দশক ধরে ডেবোরাহ ম্যাডাম আর মিস্টার বেঞ্জামিন পরস্পরের মুখ দেখেননি। কোথায় ঝামেলা ছিল দুজনের, তা নিয়ে অন্তত ২০০ বছর ধরে মানুষের মাথা থেকে কত যে ঘাম ঝরেছে! নতুন একটি তত্ত্ব হাজির হয়েছে, যাতে বলা হচ্ছে এই দম্পতির ছেলের স্বাস্থ্য ছিল তাদের সুখী দাম্পত্য জীবনের অন্তরায়। স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় ইতিহাসবিদ স্টিফেন কস এই তত্ত্ব দিয়েছেন। তিনি বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আর ডেবোরাহ রিডের হাঁড়ি-নাড়ির খোঁজ নিয়ে বলেছেন, লোকে যা ভাবত, তা সত্য নয়। লোকে ভাবত, স্ত্রীর কাছ থেকে লম্বা সময় ধরে দূরে থাকতেন কাজপাগল বেঞ্জামিন। এই জন্যই মন-কষাকষি চলত দুজনের মধ্যে। তবে ফ্রাঙ্কলিনের আত্মজীবনী, কিছু চিঠি আর পেনসিলভানিয়া গেজেট পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় পড়ে স্টিফেন কস বলছেন, এই দম্পতির ছেলেটার স্মলপক্স বা বসন্ত রোগ হয়েছিল বলেই লেগেছিল ঝামেলা।
ব্যাপারটা আরও খোলাসা হওয়া দরকার। করছিও তা-ই।
ফ্রাঙ্কলিন বসন্ত রোগের টিকা সম্বন্ধে প্রথম জেনেছিলেন ১৭২১ সালে। বোস্টনে তখন এই রোগ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের দিনের টিকার মতো ছিল না তখনকার সেই টিকা। দেওয়ার কায়দাও ছিল আলাদা। চিকিত্সক প্রথমে বসন্ত রোগে আক্রান্ত শরীরে ওঠা ফুসকুড়ি থেকে তরল টেনে নিয়ে সুস্থ মানুষের বাহুতে সামান্য মাংস কেটে তাতে ঢুকিয়ে দিতেন। বসন্ত আক্রান্ত বোস্টনে তখন পেনসিলভানিয়া গেজেট রিপোর্ট করেছিল যে কয়েক শ মানুষ স্মলপক্স ভাইরাস ঠেকাতে টিকা নিয়েছিল, তাদের ভেতর থেকে চারজন মারা গেছে।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন জানতেন বসন্ত রোগের টিকার কথা। তবে মারা যাওয়ার খবর দেখে ভয় পেয়েছিলেন বলেই হয়তো ওই রোগে আক্রান্ত ফ্রাঙ্কিকে টিকা দেননি। ফ্রাঙ্কি আর সারাহ নামে দুটি সন্তান ছিল তাঁদের। ১৭৩১ সালে মারা যায় ফ্রাঙ্কি। ফ্রাঙ্কলিন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন তাঁর কষ্টের কথা। সারা জীবন তিনি অপরাধবোধে ভুগেছেন, কেন ফ্রাঙ্কিকে টিকা দেননি ভেবে।
স্টিফেন কস ফ্রাঙ্কলিন নাকি টিকা দেবেন কি দেবেন না, এ নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিলেন। আর ডেবোরাহ টিকা দেওয়ার বিপক্ষেই মত দেন। ফলে ছেলেটাকে টিকা দেওয়ার ব্যাপারে জোরালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। কেন নিজেই দায়িত্ব নিয়ে ফ্রাঙ্কিকে টিকা দেওয়ালেন না, এই আক্ষেপ নিয়েই ১৭৫৯ সালে লিখেছিলেন, ‘যদি অভিভাবকদের কেউ একজন বা নিকটাত্মীয়দের কেউ বিরোধিতা করে [টিকা দেওয়ার ব্যাপারে], তবে অন্যজন সবার স্বাধীন মত ছাড়া শিশুকে টিকা দেবে কি না, তা বেছে নিতে পারে না, ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও পারা যায় না, অবিরাম দোষারোপই কেবল চলতে থাকে।’
মৃত্যু:
জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে নিগ্রো দাসদের দূরবস্তা দেখে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন । তাই দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন । তিনি যে কাজের সূত্রপাত করেন, উত্তরকালে লিঙ্কন তা সমাপ্ত করেন । ১৭৯০ সালে সামান্য রোগভোগের পর তাঁর মৃত্য হয় ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0