ক্লডিয়াস টলেমির জীবনী | Biography of Claudius Ptolemy

ক্লডিয়াস টলেমির জীবনী | Biography of Claudius Ptolemy

May 15, 2025 - 12:10
May 19, 2025 - 16:29
 0  2
ক্লডিয়াস টলেমির জীবনী | Biography of Claudius Ptolemy

ক্লডিয়াস টলেমি ও আলমাজেস্ট: জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর দেড় হাজার বছরের কর্তৃত্ব

ক্লডিয়াস টলেমি ( /ˈtɒləmi/ ; গ্রিক: Πτολεμαῖος , টলেমাইওস; লাতিন: Claudius Ptolemaeus ; আনু. ১০০ – আনু. ১৭০ খ্রিস্টাব্দ) একজন আলেকজান্ডারিয়ান গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, ভূগোলবিদ এবং সঙ্গীত তত্ত্ববিদ ছিলেন, যিনি প্রায় এক ডজন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে তিনটিই পরবর্তীকালে বাইজেন্টাইন, ইসলামিক এবং পশ্চিম ইউরোপীয় বিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমটি হল জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থটি, যেটি বর্তমানে আলমাজেস্ট নামে পরিচিত, যদিও এটি মূলত ম্যাথেমেটিকে সিনট্যাক্সিস বা গাণিতিক গ্রন্থের শিরোনাম ছিল এবং পরে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসাবে পরিচিত হয়। দ্বিতীয়টি হল ভূগোল, যা মানচিত্র এবং গ্রিকো-রোমান বিশ্বের ভৌগোলিক জ্ঞানের উপর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা। তৃতীয়টি হল জ্যোতিষ সংক্রান্ত গ্রন্থ যেখানে তিনি তার সময়ের অ্যারিস্টটলীয় প্রাকৃতিক দর্শনের সাথে রাশির জ্যোতিষশাস্ত্রকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এটি কখনও কখনও (Apotelesmatika) অ্যাপোটেলেসমাটিকা নামে পরিচিত (লিট। "অন দ্য ইফেক্টস") তবে এটি সাধারণত টেট্রাবিবলস নামে পরিচিত, কোইন গ্রীক থেকে যার অর্থ "চারটি বই", বা এর ল্যাটিন সমতুল্য চতুর্পার্টি দ্বারা।

বেশিরভাগ গ্রীক গণিতবিদদের থেকে ভিন্ন, টলেমির লেখা ( আলমাজেস্ট সর্বাগ্রে) কপি করা বা মন্তব্য করা বন্ধ করেনি, উভয়ই প্রাচীনত্ব এবং মধ্যযুগে।  যাইহোক, সম্ভবত খুব কম লোকই তার কাজগুলি বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় গণিতে দক্ষতা অর্জন করেছিল, যা বিশেষ করে টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার অনেক সংক্ষিপ্ত এবং ভূমিকা দ্বারা প্রমাণিত; যা আরব এবং বাইজেন্টাইনদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল।

জন্ম আনু. ১০০ খ্রিস্টাব্দ[]
মিশর, রোমান সাম্রাজ্য
মৃত্যু আনু. ১৭০ (বয়স ৬৯–৭০) AD[]
আলেকজান্দ্রিয়া, মিশর, রোমান সাম্রাজ্য

নাগরিকত্ব

রোমান; ethnicity: Greco-Egyptian
পরিচিতির কারণ টলেমিয় বিশ্বতত্ত্ব
টলেমির বিশ্ব মানচিত্র
Ptolemy's intense diatonic scale
Ptolemy's table of chords
Ptolemy's inequality
টলেমির তত্ত্ব
Equant
Evection
Quadrant

বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন

কর্মক্ষেত্র

জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, জ্যোতিষশাস্ত্র, আলোক বিজ্ঞান
যাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এরিস্টটল
Hipparchus
যাদেরকে প্রভাবিত করেছেন Theon of Alexandria
আবু মা'শার
নিকোলাস কোপারনিকাস

জীবনী

টলেমি রোমান শাসনের অধীনে মিশরের রোমান প্রদেশের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে বা তার আশেপাশে বাস করতেন, তার একটি ল্যাটিন নাম ছিল, যা সাধারণভাবে বোঝানো হয় যে তিনি একজন রোমান নাগরিকও ছিলেন, গ্রীক দার্শনিকদের উদ্ধৃতি এবং ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাবিলনীয় পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাবিলনীয় চন্দ্র তত্ত্ব। তার বর্তমান কাজের অর্ধেকের মধ্যে, টলেমি একটি নির্দিষ্ট সাইরাসকে সম্বোধন করেছেন, যার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না, কিন্তু যিনি সম্ভবত টলেমির কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানের আগ্রহগুলি ভাগ করেছিলেন।

চতুর্দশ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞানী থিওডোর মেলিটিনিওটস তার জন্মস্থানটি বিশিষ্ট গ্রীক শহর টলেমাইস হারমিউ (Πτολεμαΐς Ἑρμείου থেব্যাইড ( Θηβᾱΐς< এই প্রত্যয়নটি বেশ দেরিতে হয়েছে, এবং এটি সমর্থন করার জন্য কোন প্রমাণ নেই। ক্লডিয়াস টলেমি ১৬৮ সালের দিকে আলেকজান্দ্রিয়ায় মারা যান।

অবদান

তিনি রোমান যুগে সর্বশ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ ছিলেন। ভূগোল বিষয়ে তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্যা আউট লাইন অফ জিওগ্রাফি।

টলেমির মহাবিশ্ব

ক্লডিয়াস টলেমি (Claudius Ptolemy, ১০০-১৭০ CE) ছিলেন গ্রিকো-মিশরীয় জ্যোতির্বিদ ও গাণিতবিদ।

তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার নিকট একটি মানমন্দিরে কাজ করতেন। আকাশে তারা ও গ্রহের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করে তিনি মহাবিশ্বের একটি মডেল দাঁড় করান, যা মূলত এরিস্টটলীয় মডেলের ভিন্ন রূপ। তার প্রধান কাজ যা বছরের পর বছর তার পর্যবেক্ষণের ফসল তা মূলত পরিচিতি পায় আরবি নাম Almagest (the great system) নামে।

তার মতাদর্শ নিম্নরূপ-

ক) তিনি সূর্য নয় পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। পৃথিবীর চারপাশে বিভিন্ন গোলকে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান। পৃথিবী তার অবস্থানে স্থির।

খ) টলেমীর মতে প্রতিটি গ্রহ দুটি বৃত্তাকার পথে ঘোরে। বড়টিকে নাম দেন Deferent এবং ছোটটিকে নাম দেন Epicycle । Deferent বা বড় বৃত্তাকার পথের কেন্দ্র পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আলাদা।

গ) গ্রহগুলো ছোট বৃত্তাকার পথে (Epicycle) ঘুরতে ঘুরতে বড় বৃত্তাকার পথও (Deferent) প্রদক্ষিণ করে।

ঘ) গ্রহগুলোর গতির মূল কেন্দ্রকে বলা হয় Equant, যা পৃথিবীর কেন্দ্র ও Deferent এর কেন্দ্র থেকে আলাদা।

এ জটিল পদ্ধতিতে চিন্তার কারণ হল এই পদ্ধতিতে তখনকার সময়ে দৃশ্যমান গ্রহের গতি ও উজ্জ্বল্য ব্যাখ্যা করা যেত। যদিও তা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না।

টলেমীর এই ধারণা প্রায় এক হাজার বছর টিকে ছিল। টলেমীর পর বহু জ্যোতির্বিদের উল্লেখ পাওয়া যায় যারা সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন কিন্তু কোপার্নিকাসের পূর্বে কারো ধারণাই প্রতিষ্ঠা পায়নি।

ক্লডিয়াস টলেমি (১০০–১৮০ খ্রি.) – জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম কোষগ্রন্থ প্রণেতা

প্রাচীনকালের ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম কোষগ্রন্থের প্রণেতা, মিশরের মহাজ্ঞানী পুরুষ টলেমি (Ptolemy), যাঁর প্রকৃত নাম ক্লডিয়াস টলেমাউস (Claudius Ptolemaeus), তিনি ছিলেন প্রাচীনকালে ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম কোষগ্রন্থ প্রণেতা।

অন্য আরো অনেক জ্ঞানী ও মহাপুরুষের মতো তাঁর জীবনের কাহিনীও হারিয়ে গেছে কালের অতলগর্ভে। আজ শুধু জানা যায়, তাঁর জন্মস্থান ছিল মিশর এবং তিনি প্রসিদ্ধ আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে খ্রিস্টীয় ১২৭ অব্দ থেকে ১৫১ অব্দ পর্যন্ত জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ এই জোতির্বিজ্ঞানীকে নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করেন। মিশরে এক সময় টলেমি রাজবংশ রাজত্ব করতেন। এই রাজবংশে অনেক বিদ্যোৎসাহী নরপতিরও জন্ম হয়েছিল। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি এই রাজবংশের কেউ ছিলেন না। তিনি আরও অনেক পরের লোক।

মিশরের টলেমি রাজবংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারিণী ছিলেন রানি ক্লিওপেট্রা। তাঁর মৃত্যুর (৩০ খ্রি. পূ.) ভেতর দিয়েই এই রাজবংশের পরিসমাপ্তি ঘটে। বিজ্ঞানী টলেমির জন্ম এর আরো ১৩০ বছর পর। তাই মিশরের টলেমি রাজবংশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

সুদীর্ঘকালের ব্যবধানে টলেমির জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তারিখ হারিয়ে গেলেও তাঁর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে তাঁর জন্মস্থান এবং একটা আনুমানিক জন্ম-তারিখ ঠিক করা যায় এভাবে-

তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করতে শুরু করেন ১২৭ খ্রিস্টাব্দে এবং সর্বশেষ তারিখ পাওয়া যায় ১৪১ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার কার্যকাল বিস্তৃত ছিল ১২৭ থেকে ১৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তাঁর জীবনের এই কালপর্বের হিসেবে পাওয়া গেছে তাঁর রচিত ‘অ্যালমাজেস্ট’ (Almagest) গ্রন্থ থেকে। তবে এই গ্রন্থ রচনা করার পরও তিনি আরও প্রায় বছর দশেক জীবিত ছিলেন।

এই থেকেই অনুমান করা হয় তিনি হয়তো রোম সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস-এর সমসাময়িক লোক ছিলেন। অরেলিয়াসের রাজত্বকাল শেষ হয় ১৮০ খ্রিস্টাব্দে।

কোনো কোনো ঐতিহাসিক অনুমান করেন, তিনি হয়তো ৭৬ খ্রিস্টাব্দে কিংবা তার সামান্য কিছু পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ গবেষণগুলো সমাপ্ত করেছিলেন ১৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। তাঁর মৃত্যুকাল সম্ভবত ১৮০ খ্রিস্টাব্দ। কালের অনেক উত্থান-পতনের পরও তাঁর দুটো মূল্যবান গ্রন্থ এখনও টিকে আছে। এই গ্ৰন্থ দুটো টলেমির প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন। নাম যথাক্রমে ‘গাইড টু জিওগ্রাফি’ (Guide to Geography) এবং ‘অ্যালমাজেস্ট।

টলেমির ‘গাইড টু জিওগ্রাফি’ গ্রন্থটি হলো প্রাচীনকালের বিজ্ঞানভিত্তিক ভূগোল- রচনার প্রথম প্রচেষ্টা। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের সাহায্যে কোনো স্থানের ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়ের জন্য তিনি একটি মানচিত্র অঙ্কন করেন। তবে এ বিষয়ে প্রথম প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিপারকাস। টলেমি তাঁর ঋণ স্বীকার করে গেছেন।

টলেমির এই মানচিত্রে অনেক বিভ্রান্ত থাকলেও তাঁর ভৌগোলিক বিবরণটি পরবর্তীকালে বিশ্ববাসীর কাছে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে সমাদর লাভ করেছিল।

টলেমির ভৌগোলিক বিবরণে প্রাচীন ভাতবর্ষেরও অনেক ভৌগোলিক পরিচয় দেওয়া আছে। এসব থেকেই সেকালের ভারতবর্ষের অনেক জনপদ, নগর ও বন্দরের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি ভারতের অনেক বড় বড় পাহাড়-পর্বত এবং নদীরও নামোল্লেখ করে গেছেন। টলেমির এই বিবরণ থেকেই ভারতের বহু প্রাচীন হারানো নগরী ও জনপদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

শুধু ভারতবর্ষ নয়, টলেমির ‘গাইড টু জিওগ্রাফি’ গ্রন্থে বিশ্বের আরও বহু দেশের বর্ণনা, সেখানকার পাহাড়-পর্বত, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, মানুষ ইত্যাদির বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কথিত আছে, ১৪৭২ খ্রিস্টাব্দে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত এই মূল্যবান গ্রন্থখানা পাঠ করেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম সমুদ্রযাত্রায় অনুপ্রাণিত হন।

টলেমির অপর মূল্যবান কোষগ্রন্থ ‘অ্যালমাজেস্ট’ মোট তেরো খণ্ডে বিভক্ত। এতে মহান জ্যামিতিবিদ ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’-এর যাবতীয় জ্যামিতিক তথ্যও সংকলিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও আছে জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমির নিজস্ব আবিষ্কারসমূহের বিবরণ। তবে এই গ্রন্থে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিপারকাস। অ্যালমাজেস্টের প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচিত হয়েছে চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহের গতি, পৃথিবীর আহ্নিক গতি সংক্রান্ত বিষয়াদি। তৃতীয় খণ্ডে আলেচিত হয়েছে সূৰ্যবিষয়ক তথ্যাবলি এবং পঞ্জিকার কথা। চতুর্থ খণ্ডে আছে চন্দ্রের গতি এবং চন্দ্রগ্রহণের কথা। পঞ্চম খণ্ডে আছে সেকালের বহুলব্যবহৃত জ্যোতিষীর পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ‘আস্তারলাভ’-এর বর্ণনা। ষষ্ঠ খণ্ডে আছে গ্রহণবিষয়ক তথ্যাবলি। সপ্তম ও অষ্টম খণ্ডে আলোচিত হয়েছে নক্ষত্র পরিচিতি এবং নবম থেকে ত্রয়োদশ খণ্ডে আলোচিত হয়েছে গ্রহদের গতিবিধি এবং ভূকেন্দ্রিক মতবাদ।

‘অ্যালমাজেস্ট’ বইটির প্রকৃত নাম ছিল ‘মেগেল ম্যাথেম্যাটিক সাই নট্যাক্সি’স’ (Megale Mathematike syntaxi’s)। সাধারণভাবে এর অর্থ হলো অঙ্কশাস্ত্রের বড় কাজ। বইটির পাণ্ডুলিপি একসময় হারিয়েই গিয়েছিল। গোটা গ্রিক সাম্রাজ্যে এর কোনো কপিই ছিল না। মূল্যবান এই বইটিকে শেষরক্ষা করেছিলেন আরবের মনীষীরা। আরবি অনুবাদ করার সময় তাঁর বইটির আরবিকরণ করে নাম রাখেছিলেন ‘অ্যালমাজেস্ট’ ( Almagest )।

টলেমির এই বিখ্যাত গ্রন্থটি তাঁর সময় থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিশ্বের সেরা গ্রন্থরূপে পরিচিত ছিল। একাদশ শতাব্দীতে এটি আরবি ভষায় অনূদিত হয়। মধ্যযুগে এই অমূল্য গ্রন্থটি ‘জ্যোতিষশাস্ত্রের বাইবেল’ বলে সম্মানিত হয়েছিল। এটি আরব ও ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছিল।

টলেমির আগে কোনো কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বের (সৗরজগৎ) কথা বলেছিলেন। টলেমির জন্মেরও কয়েক শতাব্দী আগেই ইজিয়ান অঞ্চলের চিয়স দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যারিস্টারকাস বলেছিলেন, বিশ্বের (তখন বিশ্ব বলতে সৌরজগৎকেই বোঝানো হতো) কেন্দ্রবিন্দু হলো সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করেই বিশ্বের যাবতীয় বস্তুসমূহ, তথা গ্রহ-নক্ষত্র আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু অ্যারিস্টারকাসের এই বৈপ্লবিক ঘোষণাও কিন্তু সেইকালে তেমন সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়নি। বরং এর বিরোধী অর্থাৎ ভূকেন্দ্রিক ভ্রান্ত মতবাদেই সেকালে সবাই বেশি সোচ্চার ছিলেন। এই দলের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন টলেমি।

এঁরাই প্রচার করতে থাকেন, বিশ্বের যাবতীয় বস্তুসমূহ পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। তাঁরা তাঁদের ভ্রান্ত মতবাদকেই প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হাজারো রকমের নকশা ও বিশ্বকাঠামোর মডেল তৈরি করেছিলেন। যদিও টলেমিরা তাঁদের সৃষ্ট জটিল বিশ্ব-মডেলকে কখনও ত্রুটিশূন্য করতে সক্ষম হননি।

তাঁরা বলতেন, বিশ্বের সকল বস্তুই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। কিন্তু আকাশের ধ্রুব নক্ষত্র কেন স্থির থাকে তার কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর দিতে পারেননি।

তারপরও এই ভ্রান্ত মতবাদই প্রায় বারোশো বছর ধরে সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করে রেখেছিল। টলেমি, হিপারকাস এবং অ্যারিস্টটলের মতো জ্ঞানী পণ্ডিত ব্যক্তিরাও এই ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাস করতেন।

বহু বছর পরে এই ভ্রান্ত মতবাদের যিনি প্রতিবাদ করেন, তিনি হলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাস। তিনি বললেন, সূর্য ঘোরে না, পৃথিবীই ঘোরে। সেদিন যদি টলেমি অ্যারিস্টারকাস-এর মত সমর্থন করতেন, তা হলে হয়তো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসকেই নতুন করে লিখতে হতো।

শুধু এই একটি বিষয়েই নয়, এ ধরনের আরও অনেক ভ্রান্ত মতবাদের তিনি প্রবর্তক ও সমর্থক ছিলেন। যেমন, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব কত, এটা নির্ণয় করতে গিয়ে টলেমি বলেছেন, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব হলো পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের ১৮ থেকে ২০ গুণ বেশি।

এর চেয়ে সত্যের আরেকটুকু কাছাকাছি গিয়েছিলেন হিপারকাস। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হলো পৃথিবীর ব্যাসের তিরিশ গুণ।

এ দুটো মতবাদের কোনোটাই সত্যের কাছাকাছি নয়। কারণ, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হলো ৩,৮২, ১৭১ কিলোমিটার এবং পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৪ কোটি ৯৬ লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবীর ব্যাস ১২, ৬৮৩ কিলোমিটার।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর দেড় হাজার বছরের কর্তৃত্ব

ক্লডিয়াস টলেমি, প্রাচীন গ্রীক ‘টলেমিক সাম্রাজ্যের’ কোনো টলেমি নয়। ক্লডিয়াস টলেমি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি যিশুর জন্মের পর পৃথিবীতে এসেছিলেন। যার জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ দেড় হাজার বছর যাবত জোতির্বিজ্ঞানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ বিবেচনা করা হয় টলেমির ‘আলমাজেস্ট’-কে। এই বইয়ে তিনি হাজারখানেক তারকার অবস্থান, আপেক্ষিক উজ্জ্বলতা এবং ‘কনস্টেলেশন’ বা তারকাপুঞ্জ সহ একটি সারণি তৈরি করেছেন। গ্রহসমূহের গতিবিধি নিয়ে তৈরি করেছেন গাণিতিক মডেল। তার জীবন এই আলমাজেস্ট, তার কাজ এই আলমাজেস্ট। টলেমির আলোচনা মানেই আলমাজেস্টের আলোচনা!

টলেমি আলমাজেস্ট রচনা করেছিলেন তার শিষ্যদের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ‘টেক্সটবুক’ হিসেবে। বইয়ে উল্লিখিত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কোনো তারকার অবস্থান নির্ণয় করতে পারতো। একইসাথে ডাটা টেবিল ব্যবহার করে চাঁদ বা সূর্যের গ্রহণও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতো। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, টলেমির শ্রেষ্ঠ কাজ এই আলমাজেস্টের নামকরণ কিন্তু টলেমি করেননি! প্রাথমিকভাবে তিনি বইটির নাম দিয়েছিলেন ‘ম্যাথমেটিক্যাল ট্রিটিজ’। কিন্তু পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় আরবি ও গ্রীক শব্দযুগলের সমন্বয়ে গঠিত শব্দ আলমাজেস্ট। এই শব্দটির অর্থ বিশ্লেষণ করলেই অনুভব করা যাবে টলেমির এই গ্রন্থের প্রভাব। আরবি শব্দ ‘আল’ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘দ্য’। আর গ্রীক শব্দ ‘ম্যাজিস্টে’ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘গ্রেটেস্ট’। অর্থাৎ আলমাজেস্ট অর্থ ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ!

টলেমি আলমাজেস্ট রচনা করেছিলেন তার শিষ্যদের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ‘টেক্সটবুক’ হিসেবে। বইয়ে উল্লিখিত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কোনো তারকার অবস্থান নির্ণয় করতে পারতো। একইসাথে ডাটা টেবিল ব্যবহার করে চাঁদ বা সূর্যের গ্রহণও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতো। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, টলেমির শ্রেষ্ঠ কাজ এই আলমাজেস্টের নামকরণ কিন্তু টলেমি করেননি! প্রাথমিকভাবে তিনি বইটির নাম দিয়েছিলেন ‘ম্যাথমেটিক্যাল ট্রিটিজ’। কিন্তু পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় আরবি ও গ্রীক শব্দযুগলের সমন্বয়ে গঠিত শব্দ আলমাজেস্ট। এই শব্দটির অর্থ বিশ্লেষণ করলেই অনুভব করা যাবে টলেমির এই গ্রন্থের প্রভাব। আরবি শব্দ ‘আল’ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘দ্য’। আর গ্রীক শব্দ ‘ম্যাজিস্টে’ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘গ্রেটেস্ট’। অর্থাৎ আলমাজেস্ট অর্থ ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ!

বৃত্তের ‘জ্যা’ কী, এ ব্যাপারে মোটামুটি সকলেরই ধারণা আছে। ত্রিকোণমিতিক গণনায় সাইন এবং জ্যা এর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তখনকার সময়ে কোনোরূপ ক্যালকুলেটর ছিল না বিধায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত অনেক গণনায় সমস্যা হতো। সমস্যা দূরীকরণে টলেমি জ্যা এর একটি ছক তৈরি করেন। যদিও এটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যে এই ছক আসলে টলেমিরই ছিল নাকি তার পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিদ হিপারকাসের। এ আলোচনায় পরে আসছি। ছকের পরের অধ্যায়েই রয়েছে টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক মডেল। এই মডেলে টলেমি পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্রে স্থাপন করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন। পাশাপাশি বুধ গ্রহকে বলেছেন পৃথিবীর নিকটতম গ্রহ। তবে তারকারা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী বলে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন। তার তারকার সারণিতে এক হাজারের অধিক তারার স্থানাঙ্ক এবং আপেক্ষিক উজ্জ্বলতার তথ্য রয়েছে। তাছাড়া তারাগুলোকে তিনি নির্দিষ্ট তারকাপুঞ্জেও স্থাপন করেছেন। তবে এখানেও রয়েছে সেই হিপারকাস বিতর্ক!

গ্রহসমূহের গতিপথ কিংবা অবস্থান নিয়ে প্রাচীন জ্যোতির্বিদগণের ভুলের কিছু সহজ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন আধুনিক বিজ্ঞানীরা। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কোনো গ্রহের গতি পর্যবেক্ষণ করতেন আকাশে স্থায়ী তারাগুলোর অবস্থানের সাথে তুলনা করে। যেমন, নিচের ছবিটি মঙ্গলগ্রহের গতিবিধির প্রায় আট মাসের পর্যবেক্ষণ।

“টলেমি কি আসলেই কোনো পর্যবেক্ষণ করেছিল? তার পর্যবেক্ষণগুলো কি নিছকই কিছু ছক আর নিজের তত্ত্বের সহায়ক উদাহরণের হিসাব-নিকাশ নয়?”- জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিন ডেলাম্ব্রে, ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দ

গুণকীর্তন তো কম হলো না, এবার তাহলে বিতর্ক সামনে আনা যাক! প্রথমেই যে কথাটি উঠে আসে তা হচ্ছে চৌর্যবৃত্তি! অনেকেই মনে করেন টলেমি যে এক হাজার তারার তালিকা করেছিলেন তা সবই তার তিনশ বছর পূর্বে হিপারকাস করে গিয়েছিলেন। টলেমি সেগুলোকে কেবল বিষুবরেখার অয়নচলন অনুযায়ী হালনাগাদ করেন! বর্তমানে ৭৪৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকে টলেমির সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সকল তথ্য জ্যোতির্বিদরা পর্যবেক্ষণ এবং হিসেব করে দেখেছেন যে টলেমির বলে দেয়া স্থানাঙ্কের সাথে প্রকৃত স্থানাঙ্কের কোনো মিল নেই। বরং টলেমির নির্ণীত স্থানাঙ্ক কেবল তার মডেলের কাছাকাছিই যাচ্ছে। এই বিতর্কে আধুনিক বিজ্ঞানীরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছিলেন।

“আলমাজেস্ট ইতিহাসের যে কোনো কিছু থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধিক ক্ষতি করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান আরো উন্নত হতো, যদি আলমাজেস্ট লেখা না হতো!”- পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট নিউটন

১৯৭৭ সালে পদার্থবিদ রবার্ট নিউটন সরাসরি টলেমিকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে দেন। তার বই ‘ক্রাইম অব ক্লডিয়াস টলেমি’তে তিনি টলেমিকে একজন ঘৃণ্য অপরাধী হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে একদল গবেষক আবার টলেমির পাশে দাঁড়ান। তাদের মতে, টলেমি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন বটে, তবে তিনি যা সঠিক মনে করেননি তা বাদ দিয়ে দিয়েছেন কোনো পর্যবেক্ষণ ছাড়া। এখানেই তিনি ভুল করেছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘বাবলিং কলড্রন’ তত্ত্বের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সে তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো নতুন ধারণা বা চিন্তার সৃষ্টি হলে তা প্রচলিত সব ধারণার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

ঠিক যেমন উনুনের উপর একটি গরম কড়াইয়ে অনেক কিছু একসাথে সেদ্ধ হয়। তবে এক সময় তরল পদার্থগুলো বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে শুরু করলেও কঠিন বস্তুগুলো টিকে থাকে। ঠিক তেমনি কোনো চিন্তা যদি যথেষ্ট শক্তিশালী না হয়, তাহলে সেটিও বিলুপ্ত হয়। এক্ষেত্রে স্পষ্টত টলেমির তত্ত্ব ভুল হলেও অন্তত পনেরশ বছর যাবত একে ভুল প্রমাণ করবার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী তত্ত্ব আসেনি। তাই এটি একেবারেও ফেলনা নয়।

মৃত্যু: 

তিনি দেখতে কেমন ছিলেন তা-ও আমরা জানি না। আর যে ছবি আজ আমরা দেখছি, সেগুলো আঁকা হয়েছিল তার মৃত্যুর হাজার বছর পর! খুব সম্ভবত ১৭০ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন টলেমি। তার মৃত্যুর সাথেই সাথেই তার সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। শুধু রয়ে গেছে আলমাজেস্ট, ‘দ্য গ্রেটেস্ট’।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0