অ্যালান টিউরিং এর জীবনী | Biography of Alan Turing
অ্যালান টিউরিং এর জীবনী | Biography of Alan Turing
কোড-ব্রেকিং কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিংয়ের জীবনী
|
জন্ম |
অ্যালান ম্যাথিসন টুরিং
২৩ জুন ১৯১২ লন্ডন, ইংল্যান্ড
|
|---|---|
|
মৃত্যু |
৭ জুন ১৯৫৪ (বয়স ৪১) উইমস্লো, চেশায়ার, ইংল্যান্ড
|
|
মৃত্যুর কারণ |
সায়ানাইড (আত্মহত্যা) |
|
জাতীয়তা |
ইংরেজ |
|
শিক্ষা |
কিং'স কলেজ, কেমব্রিজ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচ. ডি. |
|
পেশা |
গণিতবিদ, যুক্তিবিদ, ক্রিপ্টোবিশেষজ্ঞ |
|
পরিচিতির কারণ |
টুরিং পরীক্ষা |
|
উপাধি |
Order of the British Empire Fellow of the Royal Society |
|
পিতা-মাতা |
জুলিয়াস ম্যাথিসন টুরিং এথেল স্টোনি টুরিং |
শৈশব ও শিক্ষা
টুরিং যখন তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন, তখন তার বাবা মা দুজনই ভারতের লোক প্রশাসনে কাজ করতেন। তারা চেয়েছিলেন তাদের সন্তান যাতে ইংল্যান্ডের শিক্ষা, সংস্কৃতিতে বড় হয়। তাই তারা ইংল্যান্ডে চলে আসেন এবং ১৯১২ সালের ২৩শে জুন ইংল্যান্ডের লন্ডনে অ্যালান টুরিং জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশব থেকেই টুরিংয়ের পড়ালেখার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। আর সেই ঝোঁকটা ছিল মূলত বিজ্ঞানের বিষয় গুলোতেই, আর বিশেষ আকর্ষণ ছিলো গণিতে। কিন্তু তৎকালীন শিক্ষা ছিল সাহিত্য নির্ভর। তাই ডরসেটের শেরবর্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক টুরিংয়ের এই অবস্থা দেখে, তার অভিভাবককে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নতার কথা লিখেছিলেন। এমনকি এই সাহিত্য চর্চার অনাগ্রহের জন্য তাকে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ ছেড়ে দিয়ে কিংস কলেজে ভর্তি হতে হয়েছিল।
এমন সময় তার সাথে পরিচয় হয় ক্রিস্টোফার মরকমের। তিনি টুরিং এর এক ক্লাস ওপরে পড়তেন। বন্ধুত্বহীন টুরিংয়ের জীবনে ক্রিস্টোফার তখন সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, টুরিং সেই হাতকেই গভীর আবেগ নিয়ে
আঁকড়ে ধরেন। ক্রিস্টোফারই টুরিংকে জ্ঞানের উচ্চতর শাখা, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যাতত্ত্ব সহ আরো অনেক কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ধীরে ধীরে ক্রিস্টোফারের প্রভাব পড়তে শুরু করে টুরিং এর উপর, টুরিং ভালোবেসে ফেলেন তার একমাত্র বন্ধুটিকে। ১৯৩০ সালে বোভাইন টিউবারকুলেসিসে আক্রান্ত হয়ে ক্রিস্টোফারের মৃত্যু টুরিংয়ের জীবনকে একেবারে তছনছ করে তোলে। তবুও তিনি ঘুরে দাঁড়ান, ব্যথিত মন নিয়েই আবার শুরু করেন পড়াশোনা। ১৯৩৭ সালে টুরিং চলে আসেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার উপর গবেষণা করেন আলোনজো চার্চের অধীনে। ১৯৩৮ সালে পিএইচডি লাভের পরের বছরেই তিনি চলে আসেন সরকারি কোড ও সাইফার স্কুলে যোগদানের জন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও টুরিং
শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। জার্মান নাৎজি বাহিনীর চাতুর্যে প্রায় অসহায় হয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। ওরা কোনোভাবেই নাৎজি বাহিনীর পরিকল্পনা বুঝে উঠতে পারছিল না, কারণ তাদের সমস্ত পরিকল্পনা “এনিগমা” নামের একটা মেশিন দিয়ে কোড করা অবস্থায় আদান-প্রদান করা হতো। আর সে সময় এনিগমা দ্বারা কোডেড মেসেজের অর্থোদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে নাৎজি বাহিনী নিজেদের মধ্যে এনিগমার মাধ্যমে যুদ্ধের সকল পরিকল্পনা আদান প্রদান করতো। কিন্তু ইংল্যান্ড কে জিততে হলে এনিগমার সংকেত বুঝতেই হবে। কারণ, যুদ্ধে জিততে হলে তথ্যই শক্তি! প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা জেনে ফেললে ফন্দি এঁটে তাদেরকে কাবু করা সহজ!
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এনিগমা মেশিনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন কনফিগারেশন ছিল। অর্থাৎ একটা এনিগমা সংকেতকে সমাধান করলেও সম্ভাব্য ১৫৯ মিলিয়ন মিলিয়ন উত্তর আসতো। এতো বিশাল উত্তরের মঝে কোনটা যে আসল সংকেত, সেটা বুঝে ওঠাই চিন্তার বাইরে কঠিন। রাতের বেলা উত্তরদিক নির্ধারণ করার জন্য যেমন ধ্রুবতারা লাগে, কোডেড মেসেজের অর্থোদ্ধার করার জন্যও একটা ধ্রুবতারা লাগবে। কালেভদ্রে, একদিনের জন্য সেই ধ্রুবতারা পাওয়া গেলেও ১২ ঘণ্টা পর জার্মানরা এনিগমার কনফিগারেশন বা কি-বোর্ড পরিবর্তন করলে সেই ধ্রুবতারা মোতাবেক কাজ করা আর সম্ভব হতো না। এনিগমা বোঝা এতোটাই দুর্বোধ্য ছিলো যে, “১০ জন মানুষ যদি প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা ১টি কনফিগারেশন ১ মিনিট করেও মিল খোঁজে, তবে সময় লাগবে ২০ মিলিয়ন বছর!”
এনিগমার কোড বিশ্লেষণের জন্য ইংল্যান্ডে আগেই একটি দল ছিলো। পরে এই দলে যুক্ত হন অ্যালান টুরিং। তিনি মনে করতেন “এনিগমা মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব, যন্ত্র এর সৃষ্টি এনিগমা, বুঝতে হলে উপযুক্ত যন্ত্রেরই প্রয়োজন”। এর পর তিনি ও আর তার দল মিলে, পোল্যান্ডের বিজ্ঞানী মারিয়ান রেজোস্কির আবিষ্কৃত “বোম্বা” মেশিন নিয়ে গবেষণা শুরু করে। কিন্তু টুরিং একটি সার্বজনীন ডিক্রিপ্টিং মেশিন আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। অবশেষে তিনি ‘বোম্বা’ মেশিনের এর সার্বজনীন রুপ দেন “বোম্বে (Bombe)” নামে। অনেকে মনে করেন তিনি তার মেশিনের নাম “বোম্বে” না রেখে “ক্রিস্টোফার” দিয়েছিলেন। সে যাই হোক……..
টুরিং একটা ভুল আবিষ্কার করেছিলেন এনিগমা মেশিনের মধ্যে। মেশিনের কোডিং সিস্টেমের একটা নিয়ম ছিলো। যেমন ধরুন, এনিগমা মেশিনে আমি লিখতে চাইছি ALAN TURING. তাহলে মেশিন একটা কোডেড আউটপুট দিলো KHZP GPDKDL” – নিয়মটা হলো A এর কোড কখনো A হতে পারবে না, বাকি ২৫টা অক্ষর হতে পারবে, কিন্তু A না। এতে করে সম্ভ্যাব্য কোডের সংখ্যা অনেকটা কমে গেলো। তবুও সম্ভাব্যতা এখনো অনেক, আর অনেক কষ্টের পরেও সফলতা আসছিলো না। কারণ, এই মেশিনে মেসেজ ডিকোড করে তথ্য পেতে পেতে যতক্ষণ লাগতো, ততক্ষণে সেই তথ্য আর কোনো কাজে লাগতো না। আরো দ্রুত ডিকোড করার জন্য একটা উপায়ের জন্য মরিয়া হয়ে গেলো বিজ্ঞানীদের দল। তখন টুরিং আরেকটা বুদ্ধি করলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে জার্মানরা প্রত্যেক মেসেজের শেষে Heil Hitler লেখে, অবশ্যই সংকেতের মাধ্যমে। সেটাকে ধ্রুবতারা ধরে অনেক কম সময়ের মধ্যে তারা কোডের অর্থোদ্ধার করতে সক্ষম হলেন।
ধারনা করা হয়, টুরিং এর এই যন্ত্রের ফলে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ প্রায় দু বছর আগেই শেষ হয়েছিলো এবং কয়েক কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে, ব্রিটিশ সরকার তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৪৬ সালে তাকে ” Order of the british Empire” উপাধি দান করে। যদিও ব্রিটিশ সরকার সেটা পরবর্তীতে গোপন করে গিয়েছিলো!
ব্লেচলি পার্কে কোডব্রেকিং
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ব্লেচলি পার্ক ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অভিজাত কোডব্রেকিং ইউনিটের হোম বেস। টুরিং সরকারি কোড এবং সাইফার স্কুলে যোগদান করেন এবং ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন জার্মানির সাথে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি বাকিংহামশায়ারের ব্লেচলি পার্কে দায়িত্ব পালনের জন্য রিপোর্ট করেন।
টুরিং ব্লেচলিতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে, পোলিশ গোয়েন্দা এজেন্টরা ব্রিটিশদের জার্মান এনিগমা মেশিন সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছিল। পোলিশ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষকরা বোম্বা নামে একটি কোড-ব্রেকিং মেশিন তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ১৯৪০ সালে জার্মান গোয়েন্দা পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে বোম্বা আর কোডটি ভাঙতে না পারার কারণে বোম্বা অকেজো হয়ে পড়ে।
টুরিং, তার সহযোগী কোড-ব্রেকার গর্ডন ওয়েলচম্যানের সাথে, বোম্বার একটি প্রতিরূপ তৈরিতে কাজ শুরু করেন, যার নাম বোম্ব, যা প্রতি মাসে হাজার হাজার জার্মান বার্তা আটকাতে ব্যবহৃত হত । এই ভাঙা কোডগুলি তখন মিত্রবাহিনীর কাছে রিলে করা হত এবং জার্মান নৌ গোয়েন্দা তথ্যের টুরিংয়ের বিশ্লেষণ ব্রিটিশদের তাদের জাহাজের কনভয়গুলিকে শত্রু ইউ-বোট থেকে দূরে রাখতে সক্ষম করে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে, টুরিং একটি বক্তৃতা আদান-প্রদানকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তিনি এর নাম দেন "ডেলিলাহ" , এবং এটি মিত্রবাহিনীর মধ্যে বার্তা বিকৃত করার জন্য ব্যবহৃত হত, যাতে জার্মান গোয়েন্দারা তথ্য আটকাতে না পারে।
যদিও ১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত তার কাজের পরিধি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবুও কোডব্রেকিং এবং গোয়েন্দা জগতে তার অবদানের জন্য ১৯৪৬ সালে টুরিংকে অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (OBE) অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
সমকামিতা এবং সকল গবেষণাপত্র বাজেয়াপ্তকরণ
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালের প্রযুক্তিবিদ বন্ধু আর্নল্ড ম্যুরের সাথে টুরিংয়ের সমকামিতার সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি এক সময় জানাজানি হয়ে যায়। তখন ইংল্যান্ডে সমকামিতা নিষিদ্ধ ছিল। টুরিংকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। টুরিং ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেন। কোনোরূপ বিরুদ্ধাচরণ করেননি তিনি, এমনকি এর স্বপক্ষ সমর্থন করে কোনোরূপ বিবৃতিও দেননি। আইন অনুযায়ী তাকে হয় জেলে যেতে হবে, না হয় এস্ট্রোজেন হরমোন সেবন করতে হবে। বহু চিন্তার পর টুরিং এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, তার অসমাপ্ত কাজগুলোয় মনোনিবেশ করার জন্য এস্ট্রোজেন হরমোন সেবন করাই উত্তম হবে। কিন্তু এস্ট্রোজেন টুরিংকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক দুর্বল করতে শুরু করে। কিন্তু তবু তিনি তার কাজ থেকে পিছিয়ে পড়েননি। সে সময়টাতে তিনি গবেষণা করছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। কিন্তু সমকামিতার জন্য ব্রিটিশ সরকার একে একে তার সব গবেষণা পত্র, স্বীকৃতি সব গোপন করতে শুরু করে।
টুরিং এই ব্যপারটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তাকে আর কেউ বিশ্বাস করছে না। দিন দিন এভাবে তার একাকীত্ব বাড়তে থাকে এবং এক সময় তিনি আত্মহত্যার পথটাই বেছে নেন। নিজের ৪২তম জন্মদিনের ১৬ দিন আগে, ১৯৫৪ সালের ৭ই জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ময়নাতদন্তে ফলাফলে আসে তিনি সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবেই টুরিং হারিয়ে গিয়েছিল কালের গর্ভে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
অনেকদিন ধরে কেউ মনে রাখেনি যে এই লোকটার কী অসামান্য অবদান ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে! যার জন্য মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো জিনিস নিয়ে ভাবার সাহস পেয়েছিলো, কম্পিউটার বিজ্ঞানকে যিনি দেখিয়েছিলেন অধুনিক যুগ, তার চর্চা হয়নি কোথাও।
কিন্তু সত্য চাপা থাকে না, পরবর্তীতে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ২০১৩ সালে টুরিংয়ের মৃত্যুর ৬০ বছর পর রাজকীয় ক্ষমার দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং এর তিন বছর পর ২০ অক্টোবর ২০১৬ সালে ব্রটিশ সরকার সমকামীদের যৌনকর্মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়া হাজার হাজার সমকামী ও উভকামী পুরুষকে মরণোত্তর ক্ষমা করার জন্য নতুন “টুরিং আইন” ঘোষণা করে এবং এর সাথে তাদের উপর হওয়া এমন অবিচারের জন্য ব্রিটিশ সরকার ক্ষমা চায়।
তাছাড়া কম্পিউটার বিজ্ঞানের সবচেয়ে সম্মান জনক পুরস্কারটিও তার সম্মানার্থে “Turing Award” নামে নামকরণ করা হয়েছে।
এই কিংবদন্তী গণিতবিদ, বিজ্ঞানীর জীবনী নিয়ে একটা ছবিও বানানো হয়েছে, যার নাম “The Imitation Game”.
ছবিটা দেখেও অনেকটা উপলব্ধি করা যায় তার জীবনের শৈশবের একাকীত্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার অবদান, সমকামিতা আর সমকামিতার দরুণ তার ওপর নেমে আসা নানা অপমান, অবিচার।
সবশেষে এটাই বলতে হয়, অ্যালান টুরিং তার সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রবর্তী একজন মানুষ ছিলেন। তার অকাল মৃত্যু আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের পথকে করেছে আরো দীর্ঘ, আরো বন্ধুর। কে জানে, উনি আরো কাজ করতে পারলে হয়তো আমরা আজকের আবিষ্কারগুলো আরো দশ-বিশ বছর আগেই পেয়ে যেতাম!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোডব্রেকিং কাজের পাশাপাশি, টুরিংকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে একজন পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কম্পিউটারকে তাদের প্রোগ্রামারদের থেকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখানো যেতে পারে, এবং একটি কম্পিউটার সত্যিই বুদ্ধিমান কিনা তা নির্ধারণের জন্য টুরিং পরীক্ষা তৈরি করেছিলেন।
এই পরীক্ষাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রশ্নকর্তা বুঝতে পারেন কোন উত্তর কম্পিউটার থেকে এসেছে এবং কোনটি মানুষের কাছ থেকে এসেছে; যদি প্রশ্নকর্তা পার্থক্যটি বুঝতে না পারেন, তাহলে কম্পিউটারটিকে "বুদ্ধিমান" বলে বিবেচনা করা হবে।
ব্যক্তিগত জীবন এবং প্রত্যয়
১৯৫২ সালে, টুরিং আর্নল্ড মারে নামে ১৯ বছর বয়সী এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক শুরু করেন। টুরিংয়ের বাড়িতে চুরির ঘটনায় পুলিশ তদন্তের সময়, টুরিং স্বীকার করেন যে তিনি এবং মারে যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। ইংল্যান্ডে সমকামিতা একটি অপরাধ হওয়ায়, উভয় পুরুষকেই "ঘোরতর অশ্লীলতার" অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
টুরিংকে জেল অথবা "রাসায়নিক চিকিৎসা" সহ যৌন কামনা কমানোর জন্য প্রবেশন দেওয়ার বিকল্প দেওয়া হয়। তিনি পরবর্তীটি বেছে নেন এবং পরবর্তী বারো মাস ধরে রাসায়নিক খোজাকরণ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যান।
এই চিকিৎসার ফলে তিনি পুরুষত্বহীন হয়ে পড়েন এবং তার গাইনোকোমাস্টিয়া হয়, যা স্তনের টিস্যুর অস্বাভাবিক বিকাশ। এছাড়াও, ব্রিটিশ সরকার তার নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করে এবং তাকে আর গোয়েন্দা ক্ষেত্রে কাজ করার অনুমতি দেয়নি।
মৃত্যু এবং মরণোত্তর ক্ষমা
১৯৫৪ সালের জুন মাসে, টুরিংয়ের গৃহকর্মী তাকে মৃত অবস্থায় পান। ময়নাতদন্তে জানা যায় যে তিনি সায়ানাইডের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন এবং তদন্তে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে রায় দেওয়া হয়েছে। কাছাকাছি একটি আধা-খাওয়া আপেল পাওয়া গেছে। আপেলটিতে কখনও সায়ানাইডের জন্য পরীক্ষা করা হয়নি, তবে এটিই টুরিংয়ের ব্যবহৃত সবচেয়ে সম্ভাব্য পদ্ধতি বলে নির্ধারিত হয়েছিল।
২০০৯ সালে, একজন ব্রিটিশ কম্পিউটার প্রোগ্রামার সরকারের কাছে টুরিংকে মরণোত্তর ক্ষমা করার জন্য একটি আবেদন শুরু করেন। বেশ কয়েক বছর এবং অসংখ্য আবেদনের পর, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাজকীয় করুণার সুযোগ ব্যবহার করেন এবং টুরিংয়ের দোষী সাব্যস্ততা বাতিল করে ক্ষমায় স্বাক্ষর করেন।
২০১৫ সালে, বনহ্যামের নিলাম ঘর ৫৬ পৃষ্ঠার তথ্য সম্বলিত টুরিংয়ের একটি নোটবুক ১,০২৫,০০০ ডলারে বিক্রি করে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে, ব্রিটিশ সরকার অতীতের অশ্লীলতা আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত হাজার হাজার ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য টুরিংয়ের ক্ষমার মেয়াদ বৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াটি অনানুষ্ঠানিকভাবে অ্যালান টুরিং আইন নামে পরিচিত।
soruse : bigganjatra wikipedia thoughtco
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0