লুৎফুজ্জামান বাবরের জীবনী - Biography of Lutfozzaman Babar
লুৎফুজ্জামান বাবরের জীবনী - Biography of Lutfozzaman Babar
লুৎফুজ্জামান বাবর
নেত্রকোনার কোনায় কোনায় বাবরের সেই ত্রাসের রাজত্ব
তার দাপট এমনই ছিল, যার কথায় এক সময় নেত্রকোনার কোনায় কোনায় যেন বাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি খেত। সেই তিনি কোনো গল্পের চরিত্র নয়; বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। যিনি সেখানে কায়েম করেছিলেন ভয়ংকর এক ত্রাসের রাজত্ব।
হাওর অধ্যুষিত মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৪ আসন। ২০০১ সালে ওই আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হন ক্যাসিও বাবর নামে সুপরিচিত লুৎফুজ্জামান বাবর। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় পান অতিগুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। প্রতিমন্ত্রী হলেও এককভাবে ওই মন্ত্রণালয় চালাতেন তিনি। এই সুযোগেই নেত্রকোনার অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাস আর নৈরাজ্য কায়েম করেন বাবর ও তার পরিবারের সদস্যরা।
হত্যা, ত্রাস, লুটপাত, দুর্নীতি, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাসহ পুরো নেত্রকোনাকে জর্জরিত করেছিল বাবর গংরা। ওই সময়ে নিজ চোখে এলাকায় বাবরের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যে দেখেছেন নেত্রকোনার সন্তান বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফি আহমেদ।
বাবরের যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম:
লুৎফুজ্জামান বাবর একজন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় খুনি আখ্যা দিয়ে শফি আহমেদ বলেন: স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তিনি ও তার পরিবারের লোকজন একচেটিয়ে এলাকায় নৈরাজ্য কায়েম করেছে।
তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে এলাকায় আমি ভুগেছি। নেত্রকোনা জেলায় আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান প্রশান্ত প্রায় আট মাস জেল খেটেছে। কারণ সে শুধুমাত্র আমার লোক বলে।
মদনে বাবরের ত্রাসের রাজত্ব:
মদনের আওয়ামী লীগ দুর্বল ছিল জানিয়ে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা শফি আহমেদ বলেন, যতোটুকু সম্ভব আমি মদনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল আওয়ামী লীগ নিয়েই বাবরের সন্ত্রাস নির্মূল করছি। কারণ আমি জানতাম কেউ আঘাত হানলে প্রতিরোধটা কীভাবে করতে হয়।
মদনে বাবরের সন্ত্রাসটা শুরু হয় আমার চাচাতো ভাই শফিউল ইসলাম মানিকের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ২০০১ সালে সে মন্ত্রী হবার পরে প্রথম কোরবানীর ঈদের আগের দিন রাতে তার ইশারায় আমার চাচাতো ভাই শফিউল ইসলাম মানিককে সন্ধ্যার সময় বুকের উপর উঠে জবাই করে হত্যা করে। ঈদের আগের দিন এটা একটা নির্মম ঘটনা। ঈদের দিন সকালে সেই লাশ মর্গ থেকে নিয়ে এসে মসজিদে জানাযা পড়িয়ে দাফন করা হয়।
২০০১ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপর ২০০৭ সালের ২৮ মে গ্রেফতার হন বাবর। তখন থেকে গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় জেলে ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর। তবে এরইমধ্যে তিনি গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ সব মামলা থেকেই বেকসুর খালাস পেয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লুৎফুজ্জামান বাবর সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে নিজ নির্বাচনী এলাকার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও মদন উপজেলাসহ জেলার সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলমত নির্বিশেষে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। এ কারণে তিনি পুরো জেলাবাসীর কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনগণের আস্থাভাজন ও প্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।প্রিয় নেতার মুক্তির খবর ঢাকায় ছুটে গেছেন নেত্রকোনা সদরসহ তার নির্বাচনী এলাকার (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরি) অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হয়েছে তোরণ। তৃণমূল মানুষের মাঝে দেখা গেছে উচ্ছ্বাস।স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাবরের মুক্তির খবরে নেত্রকোনা থেকে আড়াই শতাধিক বাস ও তিন শতাধিক মাইক্রোবাসে করে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ জড়ো হন। এছাড়া গণপরিবহনে ঢাকায় পৌঁছেছেন হাজার হাজার লোক।
মোহনগঞ্জে বাবরের ত্রাসের রাজত্ব:
বাবরের কিছু আত্মীয়-স্বজন এখানেও ছিল। তারা একপ্রকার মোহনগঞ্জ স্টেশন, বাস স্টেশন, কর্মক্ষেত্র গুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। এমনকি খালিয়াজুরীর ফিশারির মাছগুলোয় মোহনগঞ্জ হয়ে ঢাকা আসত।সেগুলোয় বাবরের আত্মীয়রা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।
শফি আহমেদ বলেন, মোহনগঞ্জ ছাত্রলীগের পৌর সহ-সভাপতি ছিল বাক্কি খান, দুর্দান্ত সাহসী ছেলেটাকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রদলের ক্যাডাররা রামদা দিয়ে কুপিয়ে খুন করে।
লগি বৈঠার মিছিলে মোহনগঞ্জ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মীর কাশেমকে মিছিলের মাঝ থেকে টান দিয়ে নিয়ে গুরুতর আহত করে বিএনপির ক্যাডাররা। পরে ঢাকায় একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফর জামান বাবরের স্বজন এবং নেতা কর্মীদের পদচারণায় মুখর কেরানীগঞ্জ কারাগার চত্বর।লুৎফর জামান বাবর এর মুক্তির আনন্দ ভাগ করে নিতে কেরানীগঞ্জ কারাগারের সামনে নেতা কর্মীদের জনস্রোত তৈরী হয়েছে।
বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ পাঁচজনকে হাইকোর্ট খালাস দিয়েছে। এই খালাস পাওয়ার ফলে বাবর আজই(বৃহস্পতিবার) মুক্তি পেতে পারেন, এমনটি জানিয়েছেন তার আইনজীবী শিশির মনির।
এছাড়া, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায়ও বাবরকে জামিন দেওয়া হয়েছে। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় শাহ কিবরিয়া নিহত হন। ওই হামলায় বাবরসহ বেশ কিছু কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা আসামি ছিলেন।
লুৎফুজ্জামান বাবর, যিনি নেত্রকোণা-৪ আসনের তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাবরে মুক্তি:
এদিকে, ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিলো। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আদালতের রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করছি। যারা অন্যায়ভাবে তাকে সাজা দিয়েছিল, আজ তারা তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে।বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণী।
১৫ বছর লোকচক্ষুর অগোচরে
লুৎফুজ্জামান বাবর দুদকের মামলায় ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে তাকে রাখা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে শুনানিতে দেশের বিভিন্ন আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হওয়াই ছিল এক সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর একমাত্র প্রকাশ্য উপস্থিতি। তবে গত বছরের ১২ অক্টোবরের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বাবরের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম নিউজবাংলাকে জানান, ওইদিন দুদকের মামলার রায়ের সময় বাবরের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়। বর্তমানে তাকে রাখা হয়েছে কেরানিগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
ঢাকা:
দীর্ঘ ১৭ বছরের অধিক সময় বন্দি থাকার পর কারামুক্ত হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর।
বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) দুপুর ২টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ) থেকে মুক্তি পান তিনি। এর মধ্য দিয়ে ১৭ বছরের বন্দি জীবন শেষ হলো তার।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) সিনিয়র জেল সুপার সুরাইয়া আক্তার এ তথ্য নিশ্চিত করেন।।বাবরের মুক্তির খবরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিএনপির নেতাকর্মী ও তার নেত্রকোনা এলাকা থেকে দলে দলে লোকজন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে ভিড় করেন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0