রেনি ডেকার্ত এর জীবনী | Biography of René Descartes
রেনি ডেকার্ত এর জীবনী | Biography of René Descartes
স্বপ্নাদেশ পালন করে যিনি দার্শনিক হয়েছেন!
|
জন্ম |
৩১ মার্চ ১৫৯৬ লা হায়ে অ ত্যুরাইন, ফ্রান্স রাজত্ব
|
|---|---|
|
মৃত্যু |
১১ ফেব্রুয়ারি ১৬৫০ (বয়স ৫৩) স্টকহোম, সুইডিশ সাম্রাজ্য
|
|
জাতীয়তা |
ফ্রেঞ |
|
শিক্ষা |
|
|
যুগ |
17th-century philosophy |
|
অঞ্চল |
পশ্চিমা দর্শন |
| ধারা |
|
|
প্রধান আগ্রহ
|
অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান |
|
উল্লেখযোগ্য অবদান
|
|
র্যনে দেকার্ত:
(ফরাসি: René Descartes) একজন ফরাসি দার্শনিক, গণিতজ্ঞ এবং বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি পাশ্চাত্য দর্শনে আধুনিক দর্শনের জনক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি একজন দ্বৈতবাদী দার্শনিক ছিলেন। তাছাড়া তিনি জ্যামিতি ও বীজগণিতের মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপণ করেন, যার দ্বারা বীজগণিতের সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান সম্ভব হয় (স্থানাঙ্ক জ্যামিতি)। তিনি বস্তু সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দেন।
জন্ম ও শৈশব
দেকার্ত ১৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ শে মার্চ লা হায়ে অ ত্যুরাইন এ জন্ম গ্রহণ করেণ। তার পিতা জোয়াকিম দেকার্ত এবং মাতা জান ব্রোশার। তার আরো এক ভাই (পিয়ের) ও এক বোন (জান) ছিল। দেকার্তের পিতা একধারে একজন উকিল ও ম্যাজিস্ট্রট ছিলেন, ফলে সংসারে তিনি বেশি সময় দিতে পারতেন না। জান ব্রোশার দেকার্তের জন্মের দুই মাস পর মে মাসে মারা যান; তখন দেকার্ত এবং তার অন্য দুই ভাই ও বোন লা এ-তে তাদের দাদীর কাছে চলে যান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বাস করেছেন।
শিক্ষা
প্রায় দশ বছর বয়সে ১৬০৬ সালে দেকার্তকে কলেজ রইয়াল অঁরি-ল্য-গ্রঁ (ফরাসি Collège Royal Henry-Le-Grand) জেসুইট কলেজে পাঠানো হয়। তিনি সেখানে ১৬১৪ সাল পর্যন্ত পড়েন এবং ১৬১৫ সালে পোয়াতিয়ে (Poitiers) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একবছর পর তিনি ধর্মীয় অনুশাসন ও দেওয়ানি আইনে বাকালোরেয়া (baccalauréat, অর্থাৎ "উচ্চ-মাধ্যমিক সনদ") ও লাইসেন্স লাভ করেন।
কর্মজীবন
তরুণ বয়সেই মানুষ এবং মহাবিশ্বের স্বরূপ জানার জন্য একটি অন্তর্দৃষ্টি পাবার প্রবল ইচ্ছা জাগে তার মনে। গভীর অধ্যয়নের পরে দেকার্ত এই সিদ্ধান্তে আসেন যে ইউরোপীয় মধ্যযুগ থেকে যে জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এসেছে তা খুব নির্ভরযোগ্য নয়। তিনি ঠিক করলেন সারা ইউরোপ ঘুরে বেড়াবেন, ঠিক যেমন সক্রেটিস অ্যাথেন্সের লোকের সাথে কথা বলে জীবন কাটিয়েছিলেন। এ কারণে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধে চলে গেলেন তিনি, তার ফলে মধ্য ইউরোপে কিছু দিন থাকার সুযোগ হল তার। সেনাবাহিনীতে তিনি কী করতেন তা সঠিক ভাবে জানা যায় না। ১৬১৯ সালে তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। এর পর প্যারিসে কাটান কিছু বছর, তারপর ১৬২৯ সালে চলে যান হল্যান্ড।
রেনে দেকার্ত
১৫৯৬ খৃস্টাব্দের ৩১ মার্চ ফরাশিদেশের মেন-ত-এ লোয়ার-এর তুরেইন এলাকার লা হেই নামের ছোট্ট শহরে দেকার্তের জন্ম। তিনি ছিলেন পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর জন্মের এক বছর পর তাঁর মা জ্যঁ ব্রোচার্ড মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা জোয়াকিম দেকার্ত আবার বিয়ে করেন। দেকার্তের প্রতিপালনের দায়িত্ব পড়ে তখন তাঁর পিতামহীর ওপর। এছাড়া একজন গৃহ-পরিচারিকাও তাঁকে শৈশবে সযত্নে দেখাশোনা করেছেন। সেই মহিলার প্রতি দেকার্ত ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তাঁকে তিনি ভরণপোষণ করেছেন আমৃত্যু। ছোটোবেলায় তিনি ছিলেন অতিশয় রোগাটে। এমনকি বাঁচবেন, এ ভরসাও ছিলো না। তবে কুড়ি বছর বয়সের পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো ছিলো।
ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভাবুক স্বভাবের। সমবয়েসীরা যখন খেলাধুলায় মশগুল, তিনি তখন দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যাপার নিয়ে চুপচাপ বসে ভাবতেন। এজন্য তাঁর বাবা তাঁকে ‘ক্ষুদে দার্শনিক’ বলে ঠাট্টাও করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষুদে নয়, বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের একজন হয়ে ওঠেন দেকার্ত।
পারিবারিক প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার পর ১৬০৪ সালে দেকার্ত লা ফ্লেইচের ‘জেসুইট কলেজে’ ভর্তি হন। আট বছর তিনি সেখানে পড়াশোনা করেন। তাঁর পাঠ্যবিষয়ের অন্তর্গত ছিলো অঙ্ক, ক্লাসিক সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র, লজিক, অধিবিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যা। তবে এসবের মধ্যে অঙ্কই ছিলো তাঁর প্রিয় বিষয়। জেসুইট কলেজ ছিলো ইউরোপের
শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর একটি। দেকার্তের মতে, ‘ইউরোপের শ্রেষ্ঠতম’। এখানে পড়াশোনার সময়ই তাঁর জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। দর্শন ও বিজ্ঞান দু’দিকেই তাঁর সমান আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। অ্যারিস্টটলের দর্শন তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়েন। কবিতার প্রতিও ছিলো তাঁর আগ্রহ। তবে শুধু পাঠ্যবই নয়, বাস্তবজীবন থেকেও তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ব্যাপক ভ্রমণ করেছেন তিনি এবং এই ‘বিশ্বের মহাগ্রন্থ’ (The book of the world) থেকে অর্জন করেছেন জ্ঞান। তা ছাড়া ভাবুক দেকার্ত তাকিয়েছেন নিজের ভেতরে। জীবনের নানা প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজেছেন। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার চেষ্টা করেছেন যুক্তির আলোকে।
রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মে ছিলেন দেকার্ত। ধর্মীয় পরিবেশেই তিনি বেড়ে ওঠেন এবং আমৃত্যু ক্যাথলিকবাদে ছিলো তাঁর গভীর বিশ্বাস। বিজ্ঞানী হয়েও তিনি ছিলেন অবিচল আস্তিক।
শারীরিক কারণেই হোক বা অলসতার কারণেই হোক, দুপুরের আগে বিছানা থেকে উঠতেন না দেকার্ত। রোজ অন্তত আট-দশ ঘণ্টা ঘুমাতেন। লম্বা ঘুমের জন্যই যে তিনি বিছানায় থাকতেন তাই নয়, বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়াশোনা করাও ছিলো তাঁর অভ্যাস। তা ছাড়া তিনি শীত সহ্য করতে পারতেন না। যথেষ্ট গরম ঘর ছাড়া তাঁর চলতো না, বিশেষত শীতকালে।
১৬১২ সালে তিনি জেসুইট কলেজের পড়া শেষ করেন। তারপর ভর্তি হন পোয়াতো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে অধ্যয়ন করেন আইন। বাবা জোয়াকিম দেকার্ত ছিলেন তাঁর এলাকার একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। তাঁর আয়ও ছিলো প্রচুর। তিনি চাইতেন, তাঁর ছেলে রেনেও আইনজীবী হয়ে উঠুক। বাবার ইচ্ছেতেই তিনি আইন পড়েন। ১৬১৬ সালে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন পোয়াতো থেকে। ডিগ্রি নিলেও দেকার্ত কোনোদিন আইনব্যবসা করেন নি।
কিছুকাল সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিলো তাঁর। ১৬১৭ সালে তিনি নাসাউ-এর প্রিন্স মরিসের সেনাদলে যোগ দেন। কিন্তু সৈনিকের জীবনও তাঁর ভালো লাগলো না। এ সময়টায় দর্শন নয়, গণিতের প্রতি ছিলো তাঁর অপার আগ্রহ। ১৬১৮-১৯ সালে ব্রেদা-তে গণিতজ্ঞ আইজাক বিকম্যানের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। বিকম্যান ছিলেন ডরটমুন্ড কলেজের রেক্টর। অঙ্ক, পদার্থবিদ্যাসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে তাঁরা গবেষণার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় তিনি ক্লান্তি বোধ করছিলেন। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জনের জন্য তাই তিনি ব্যাপক দেশভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।
১৬১৯ সালের এপ্রিলে তিনি প্রথম বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি যান জার্মানির ছোট্ট শহর নিউবার্গ-এ। সেখানে একটি শীতকাল তিনি অতিবাহিত করেন এবং পুরো শীতকালটিই একটি ‘পর্যাপ্ত উষ্ণ কক্ষে’ থেকে পড়াশোনা করেন এবং প্রধানত ঘুমিয়ে কাটান। তিনি বলেছেন, নিউবাগে থাকার সময় অনেকটা অলৌকিকভাবে স্বপ্নের মাধ্যমে একটা বৈজ্ঞানিক সত্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়। পদার্থবিদ্যার প্রতি তিনি গভীরভাবে ঝুঁকে পড়েন এবং পরবর্তী ন’বছর তিনি তাঁর স্বপ্নদত্ত বৈজ্ঞানিক-তত্ত্ব আবিষ্কারে নিয়োজিত থাকেন। এই সময় বীজগণিত হয়ে ওঠে তাঁর চর্চার অন্যতম প্রধান বিষয়।
১৬২২ সালে দেকার্ত স্বদেশে ফিরে আসেন। মায়ের পক্ষ থেকে তিনি কিছু সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। কিন্তু ভাবুক দেকার্তের ওসব বৈষয়িক ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলো না। তিনি ও-সব একটা ঝামেলাবিশেষ বলেই মনে করতেন। তাই সেই সম্পত্তি তিনি অচিরেই বেচে দেন। এবং তা থেকে যে অর্থ হাতে আসে, তা ব্যয় করতে থাকেন দেশভ্রমণে। সুইজারল্যান্ড, ইতালি, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন তিনি।
১৬২৫ সালে তিনি ফিরে আসেন প্যারিসে। তারপর তিনি তিনটি বছর এখানে কাটান। নির্জনস্বভাবের হলেও এই সময় তিনি বেশকিছু বন্ধুবান্ধবের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় সবাই ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী। ১৬২৮-এ তিনি আরো একবার কিছুদিন সেনাবাহিনীতে ছিলেন।
দেকার্ত ছিলেন চিরকুমার। কিন্তু তাঁর একটি পালিতা মেয়ে ছিলো, যাকে বলা হতো ‘প্রকৃতিদত্ত কন্যা’। মেয়েটিকে তিনি কোথা থেকে কিভাবে পেয়েছিলেন, সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ওর প্রতি তাঁর স্নেহভালোবাসা ছিলো অপার। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মেয়েটি মারা গেলে গভীর দুঃখ পান দেকার্ত। আজীবন তিনি এই শোক বহন করেছেন।
প্যারিসের কোলাহলময় জীবন একসময় দুঃসহ হয়ে ওঠে তাঁর কাছে। নির্জনতা আর শান্তির সন্ধান করছিলেন তিনি। হল্যান্ড ছিলো সেকালের ইউরোপে এক আদর্শ দেশ—শান্ত ও কোলাহলমুক্ত। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সেখানে গিয়েই স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। ১৬২৯ সালে তিনি প্যারিস থেকে হল্যান্ডে চলে আসেন। এরপর প্রায় একনাগাড়ে কুড়ি বছর তিনি হল্যান্ডেই অতিবাহিত করেন। তাঁর প্রধান দার্শনিক গ্রন্থাবলি ওখানে বসেই রচনা করেন। সেকালে লেখকদের অবাধ স্বাধীনতা ছিলো না, যেমন আজকেও পৃথিবীর বহু দেশে নেই।
তবে তুলনামূলকভাবে ফরাশিদেশের চাইতে হল্যান্ডে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিলো বেশি। তিনি কিছুটা ভীরু প্রকৃতির ছিলেন বলে ফরাশি রাজাদের তিনি ভয় করতেন। তবে নিজে একজন রোমান ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী কর্তৃক সূর্য প্রদক্ষিণের যে- তত্ত্ব কপারনিকাস ও গ্যালিলিও প্রচার করেছিলেন, সেটা বিশ্বাস করতেন মনপ্রাণে। এই সমর্থন প্রকাশ পেয়েছিলো তাঁর ‘লা মঁদ’ গ্রন্থে। কিন্তু গ্যালিলিওর নিয়তির কথা বিবেচনা করে গির্জার ভয়ে তিনি ‘লা মঁদ’-এর প্রকাশ বন্ধ রাখেন। পুরো গ্রন্থটি কোনোদিনই প্রকাশিত হয় নি, তবে দেকার্তের মৃত্যুর পর তার অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়। গ্যালিলিওর প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
দর্শন হলো জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এক সামগ্রিক ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের বিষয়, নানা সময় নানা দার্শনিক নানা পদ্ধতিতে দর্শন আলোচনা করেছেন। সকল পদ্ধতিরই উপযোগিতা রয়েছে। কিন্তু কোনোটিকেই সর্বসম্মত বা একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় বলা যাবে না। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা জীবন ও জগতের যে-স্বরূপ উপলব্ধি করি, সেটাই কি সত্য ও সঠিক? নাকি জ্ঞানের জন্য ইন্দ্রিয়ের বাইরেও রয়েছে এক অতীন্দ্রিয় জগতের অস্তিত্ব! চোখ, কান, নাক, ত্বক আর জিবের সাহায্যে আমরা দৃশ্যমান জগতের যে-স্বরূপ উপলব্ধি করি, সেটা হলো বাহ্য-জ্ঞান। অন্যদিকে, বস্তুর অন্তর্নিহিত স্বরূপ ও বাহ্যরূপ নিয়ে অধিবিদ্যা আলোচনা করে। বস্তুজগতের অভ্রান্ত জ্ঞানের জন্য আমাদের বিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিজ্ঞান বস্তুজগতের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে।
কিন্তু অতীন্দ্রিয় জগৎ বা পরম-সত্তা প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য গভীর প্রজ্ঞা অথবা অনুধ্যান প্রয়োজন। অর্থাৎ একটি অভিজ্ঞতালব্ধ (Emperical), এবং অপরটি অনুধ্যানমূলক ( Reflective) জ্ঞান। বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। কেউ অবুদ্ধিবৃত্তিক (Non-intellectual) পথ অনুসরণ করে অগ্রসর হয়েছেন; কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক (intellectual) পথ বেছে নিয়েছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার ওপরই জোর দেয়া হয়েছে বেশি। বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি আবার নানা রকম : বিচারবিবর্জিত মতবাদ (Dogmatism), সংশয়বাদ (Scepticism), বিচারবাদ (Criticism) এবং দ্বান্দ্বিক (Dialectical)। ডগম্যাটিজম দু’ ধরনের—বুদ্ধিবাদ (Rationalism) এবং অভিজ্ঞতাবাদ (Empericism )। বুদ্ধিবাদে প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিই জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায়। এই মতবাদের সমর্থকরা বলেন, ইন্দ্ৰিয়লব্ধ জ্ঞান অসম্পূর্ণ। প্রজ্ঞাই আমাদের সঠিক জ্ঞান দেয়। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে দেকার্ত, লাইবনিজ, স্পিনোজা প্ৰমুখ এই মতবাদ অনুসরণ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রত্যক্ষণ নয়, প্রজ্ঞাই জ্ঞান লাভের উপায়।
ষোড়শ শতকে ফরাশিদেশে একদল সন্দেহবাদী দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা প্রশ্ন তুলতেন, পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন সম্ভব কিনা। সতেরো শতকের প্রথমার্ধে দেকার্তের আবির্ভাব ঘটে। তিনিই গভীর ভেবেচিন্তে এমন একটি দার্শনিক পদ্ধতি বের করেন, যাতে সন্দেহের কোনোরকম অবকাশ থাকবে না।
দেকার্তের উদ্দেশ্য ছিলো, দর্শনকে যাবতীয় সন্দেহ থেকে মুক্ত করে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। তিনি সবকিছুর অস্তিত্বে প্রকাশ করলেন সন্দেহ। যেহেতু তিনি ছিলেন গণিতবিদ, তাই তিনি মনে করলেন, গাণিতিক সত্যে (Mathematical truths) কোনো সন্দেহের সুযোগ নেই। যেমন দুই আর তিনের যোগফল পাঁচ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। দর্শনের ক্ষেত্রেও তিনি তেমনই একটা সন্দেহাতীত পদ্ধতির অনুসন্ধানে ব্রতী হলেন। অবশেষে তিনি ঘোষণা করলেন, সবকিছুর অস্তিত্বে সন্দেহ করলেও, ‘সন্দেহ’ এবং সন্দেহকারীর অস্তিত্বে কোনো সন্দেহ নেই।
দেকার্ত বলতেন, জন্মের পর থেকে আমরা পরিবার ও সমাজে বাস করে এমন সব জ্ঞান ও ধ্যানধারণা অর্জন করি, যা সন্দেহমুক্ত নয়। মনকে সেইসব ভুল ধারণার কবল থেকে মুক্ত করতে হবে। কারণ ইন্দ্রিয়প্রসূত জ্ঞান অভ্রান্ত নয় এবং তা অনিশ্চিত। আমরা এমন অনেক স্বপ্ন দেখি যার বাস্তব ভিত্তি নেই। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে পরিদৃশ্যমান জগতের মুখোমুখি হচ্ছি, সেটা যে স্বপ্নের মতোই অলীক ও ভিত্তিহীন নয়, তার নিশ্চয়তা কোথায়? দেকাত অবশেষে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুলেন যে, সবকিছু মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু যে ‘আমি’ এই জগৎ নিয়ে চিন্তা করছি, সেই ‘আমি’ মিথ্যা নই। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমি যে সংশয় প্রকাশ করছি, তাতেই প্রমাণিত আমি অস্তিত্বশীল। তিনি বললেন, সবকিছু মিথ্যা হলেও যিনি চিন্তা করছেন, সেই মানুষটি মিথ্যা নন। তাই তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি আছি’ ( think, therefore, I am Cogito ergo sum)। অস্তিত্ব প্রমাণে এটা তাঁর মূল বাক্য। এটাই তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি।
দেকার্তের মতে, কতগুলো স্বতঃসিদ্ধ ধারণা থেকে অন্যান্য ধারণায় পৌঁছুনো সম্ভব। তিনি বলেছেন, জন্মমুহূর্তেই ঈশ্বর মানুষের মধ্যে কিছু স্বতঃপ্রসূত ধারণা ( innate ideas ) দিয়ে দিয়েছেন। এই আজন্মের স্বতঃপ্রসূত ধারণাগুলো নির্ভুল। এগুলোর সাহায্যেই আমরা অন্যান্য সত্যের সন্ধান পাই। এ-জাতীয় ধারণার মধ্যে রয়েছে পরমসত্তা, কার্যকারণ সম্পর্ক, অসীমতা, চিরন্তনতা ইত্যাদি। আগেই বলা হয়েছে, দর্শনে তিনি গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগের পক্ষপাতী ছিলেন। এই পদ্ধতিই অভ্রান্ত জ্ঞান অর্জনের প্রধান উপায়। গণিতের মতো দর্শনেও কতগুলো স্বতঃসিদ্ধ ধারণা থেকে অবরোহী পদ্ধতিতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। তাতে নির্ভুল জ্ঞান অর্জন সম্ভব। দেকার্ত ও তাঁর অনুসারী অন্যান্য দার্শনিকের এই বুদ্ধিবাদী তত্ত্ব তাঁদের বিরুদ্ধবাদীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। প্রতিপক্ষের বক্তব্য : অভিজ্ঞতালব্ধ সমস্ত জ্ঞানই ভুল হতে পারে না। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত অনেক জ্ঞান অবশ্যই অভ্রান্ত।
দেকার্তের মতে, সত্যের বৈশিষ্ট্য হলো স্পষ্টতা ও স্বাতন্ত্র্য (Clearness and distinctness)। তাঁর কথায়, আত্মচৈতন্য (self-consciousness ) হলো স্বতঃপ্রসূত জ্ঞান। আত্মচৈতন্য বা আত্মজ্ঞান থেকে নিশ্চিতভাবেই স্রষ্টার জ্ঞানও লাভ করা যায়। এবং ঈশ্বর-জ্ঞানের সাহায্যে সুস্পষ্টভাবেই ঈশ্বর সৃষ্ট জগৎ ও জীবন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন সম্ভব।
এই বিশ্বব্রক্ষ্ম সংখ্যাহীন বস্তুর সমষ্টি। বস্তু (Substance) সম্পর্কে দেকার্তের ধারণা অনেকটা তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধিবাদী দার্শনিকদের মতোই। তাঁর মতে, যে দ্রব্যকে অন্য ধারণার সাহায্য ছাড়া উপলব্ধি করা যায়, তাই বস্তু। তিনি তিনটি বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন—ঈশ্বর, মন ও জড়। ঈশ্বর হলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্থাৎ অন্য দ্রব্যনিরপেক্ষ। কিন্তু মন ও জড় পরস্পর নিরপেক্ষ হলেও তারা ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল। মনের ধর্ম হলো চেতনা এবং জড়ের ধর্ম হলো আকার বা বিস্তৃতি। মন এবং জড় হলো পরস্পরবিরোধী দ্রব্য। মনের বিস্তৃতি নেই, চেতনা আছে, কিন্তু জড়ের চেতনা না থাকলেও আছে বিস্তৃতি। এই জগতের সমস্ত অস্তিত্বশীল বস্তু দু’ভাগে বিভক্ত : জড়াত্মক (material) এবং মানসিক (mental)। তাঁর মতে, জড় বস্তু যান্ত্রিক নিয়মে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু মন উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত।
রেনে দেকার্ত ফরাসি দার্শনিক, গণিতজ্ঞ এবং বিজ্ঞানী। তিনি পাশ্চাত্য দর্শনে আধুনিক দর্শনের জনক হিসেবে খ্যাত। একজন দ্বৈতবাদী দার্শনিক দেকার্ত জ্যামিতি ও বীজগণিতের মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপণ করেন, যা বীজগণিতের সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান সম্ভব হয় (স্থানাঙ্ক জ্যামিতি)। তিনি বস্তু সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দেন। দেকার্ত ১৫৯৬ সালের ৩১ মার্চ লা হায়ে অ ত্যুরাইনে জন্মগ্রহণ করেন। গভীর অধ্যয়নের পর দেকার্ত এই সিদ্ধান্তে আসেন, ইউরোপীয় মধ্যযুগ থেকে যে জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এসেছে, তা খুব নির্ভরযোগ্য নয়। এক সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি।
দেকার্ত দার্শনিক সমস্যা সমাধানের একটি পদ্ধতির প্রস্তাব করেন। দেকার্তের মতে, কোনো কিছুকে পরিষ্কারভাবে এবং ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত আমরা সেটাকে সত্য বলে ধরে নিতে পারি না। সেজন্য কোনো জটিল সমস্যাকে যতগুলো সম্ভব একক সমস্যায় ভেঙে নেওয়া বা ছোট করে নেওয়া দরকার। দেকার্ত বললেন, দুই ধরনের বাস্তবতা বা সারবস্তু রয়েছে। একটি সারবস্তু হচ্ছে চিন্তা বা মন, অন্যটি ব্যাপ্তি বা বস্তু। মন পুরোপুরি সচেতন এবং স্থানগত দিক দিয়ে কোনো জায়গা দখল করে না। ফলে এটাকে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করা যায় না। অন্যদিকে বস্তু জায়গা দখল করে এবং একে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে ভাগ করা চলে। বস্তুর কোনো চেতনা নেই। দেকার্তের মতে, দুই সারবস্তুই ঈশ্বর থেকে এসেছে, যদিও এ দুই সারবস্তুর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
মৃত্যু:
১৬১৯ সালে তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। এর পর প্যারিসে কাটান কিছু বছর, তারপর ১৬২৯ সালে চলে যান হল্যান্ড। সেখানে গণিত আর দর্শন বিষয়ক লেখালেখি নিয়ে কাটিয়ে দেন প্রায় বিশ বছর। ১৬৪৯ সালে রাণী ক্রিস্টিনার আমন্ত্রণে সুইডেন যান এবং সেখানে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের শীতকালে মৃত্যুবরণ করেন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0