জেন গুডল এর জীবনী | Biography of Jane Goodall

জেন গুডল এর জীবনী | Biography of Jane Goodall

May 16, 2025 - 16:23
May 24, 2025 - 11:45
 0  1
জেন গুডল এর জীবনী | Biography of Jane Goodall

জেন গুডাল: যার জীবন কেটেছে শিম্পাঞ্জিদের সাথে বন্ধুত্ব করে

জন্ম

৩ এপ্রিল ১৯৩৪ (বয়স ৯১)
লন্ডন, ব্রিটিশ এম্পায়ার

মৃত্যু

১৯৮০ সালে ড্যারেক দুর্ঘটনায় মারা যান

মাতৃশিক্ষায়তন

নিয়নহাম কলেজ, কেমব্রিজ
ড্রউইন কলেজ, কেমব্রিজ

পরিচিতির কারণ

বানর তত্ত্ব বিশ্লেষক,পশু কল্যাণ ও সংরক্ষণ

পুরস্কার

কিয়োটো পদক (১৯৯০)
হুবার্ড পদক (১৯৯৫)
পরিবেশগত অবদানের জন্য টিলার পুরস্কার (১৯৯৭)
অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (২০০৪)

বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন

ডক্টরাল উপদেষ্টা

রবার্ট হাইড

ডেম জেন গুডঅল,

 অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (/ˈɡʊdˌɔːl/; ভালেরি জেন মরিস গুডঅল একজন ইংরেজ প্রাইমেটলজিস্ট এবং নৃবিজ্ঞানী । তিনি মূলতঃ শিম্পাঞ্জি বিশেষজ্ঞ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ১৯৬০ সালে তানজানিয়ায় যাওয়ার পর থেকেই সেখানে এক নাগাড়ে ৫৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্য শিম্পাঞ্জির সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি একাধারে জেন গুডঅল ইন্সটিটিউট এবং দ্যা রূটস্ এন্ড সুটস এর প্রতিষ্ঠাতা। একই সাথে তিনি পশু সংরক্ষণ এবং কল্যাণ বিষয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেছেন।১৯৯৬ সাল থেকে তিনি নন-হিউম্যান রাইটস প্রজেক্টে অবদান রাখছেন।

প্রাথমিক জীবন

জেন গুডঅল ১৯৩৪ সালে লন্ডন, ব্রিটিশ এম্পায়ারে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতার নাম হার্বার্ট মরিস গুডঅল ও মাতার নাম মার্গারেট ম্যানফ্যানউই জোসেফ । জন্মের পর থেকেই তার জীবপ্রেম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে থাকে। বাল্যকালে পিতার কাছ থেকে পাওয়া "জুবলি" নামক এক খেলনা বানর প্রাপ্তির মাধ্যমে প্রাইমেট বর্গের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। পরবর্তীতে বাস্তব জীবনেই তিনি বানর প্রজাতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। 

ব্যক্তিগত জীবন

গুডঅল দুইবার বিয়ে করেছেন। ২৪ মার্চ, ১৯৬৪ সে একজন ডাচ বন্য জীবন চিত্রগ্রাহক ব্যারন হুগো ফ্যান লাভিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি লন্ডনের একজন নামকরা ফটোগ্রাফার ছিলেন। এই দম্পত্তির এক পুত্র সন্তান রয়েছেন। ১৯৭৪ সালে এই দম্পত্তির বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে সে ডিরেক ব্রাইকিসানকে (তানজানিয়ার সাবেক সাংসদ ও জাতীয় পার্কের সাবেক পরিচালক) বিয়ে করেন। ডিরেক অক্টোবর ১৯৮০ সালে ক্যানসারে মারা যান।

আফ্রিকা

গুডঅল সবসময় প্রাণী এবং আফ্রিকা সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন । তিনি ১৯৫৭ সালে কেনিয়ায় এর বন্ধুর ফার্মে যান। সেখানে তিনি কিছুদিন তার এক বন্ধুর সহায়িকা হিসেবে কাজ করেন। এরপর তাকে জন নেপার এবং ওসামা হিলের সাথে লন্ডন, ইংল্যান্ডে পশুর ওপরে পড়ালেখার জন্য পাঠানো হয়। তখন তিনি একজন শিম্পাঞ্জি গবেষণাকারী হিসেবে একজন হোমিডিস বিশেষজ্ঞের সহায়িকা হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সূত্রে তাকে তানজানিয়া পাঠানো হয়। সেখানে তিনি গম্বি স্ট্রিম জাতীয় পার্কে তার গবেষণা শুরু করেন।

কর্মজীবন

গম্বি স্ট্রিম জাতীয় পার্কে গবেষণা

গুডঅল শিম্পাঞ্জিদের সামাজিক ও পারিবারিক গবেষণার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তিনি কাসাখেলা শিম্পাঞ্জি কমিউনিটি নিয়ে তানজানিয়ার গম্বি স্ট্রিম জাতীয় পার্কে ১৯৬০ সালে গবেষণা শুরু করেন। তিনি শিম্পাঞ্জি পর্যবেক্ষণের সময় তাদের নাম্বার দ্বারা মনে না রেখে সে শিম্পাঞ্জিদের ফিফি, ডেভিড এরকম নাম প্রদান করতেন। সে প্রত্যেকের সাথে এক এক জন আলাদা মানুষের মতো আচরণ করতেন, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অভাবনীয় ছিলো।

তার দেয়া বানরদের কিছু নাম:

  • ডেভিড গ্রেব্রেড, ধূসর রং-এর গুডঅলের পর্যবেক্ষিত প্রথম শিম্পাঞ্জি;
  • গোলিয়াত, ডেভিড গ্রেব্রেডের বন্ধু, অন্যদের চেয়ে বড় বপু এবং দলের নেতা হওয়ার কারণে গোলাইত নাম দেওয়া হয়;
  • মাইক, গোলিয়াতের মতই আরেক শিম্পাঞ্জি;
  • হামাফ্র, বড়, শক্তিশালী ও অন্যদের বিরক্ত করতে পটু পুরুষ বানর;
  • গিগি, একটা বড় ও মোটা মেয়ে শিম্পাঞ্জি , অন্য সব শিম্পাঞ্জিরা একে "আন্টি" বলে ডাকতো;
  • মি. ম্যাক, এক বুদ্ধিমান বৃদ্ধ পুরুষ শিম্পাঞ্জি;
  • ফোলো, বড় নাকযুক্ত ও লম্বা নাকাওলামা শিম্পাঞ্জি; ফিগান, ফাবেন, ফ্রিডু, ফিফি এবং ফালিন্ট;
  • ফ্রোডো, ফিফির দ্বিতীয় সন্তান

তিনি মনে করেন, "শুধু মানুষ-ই নয় শিম্পাঞ্জিদের মাঝেও সুখ, দুংখ,আনন্দ ও ভালবাসা রয়েছে "[তিনি শিম্পাঞ্জিদের জড়িয়ে ধরে, চুমু খেয়ে এমন কি কথা বলে তাদের আচরণের সাথে মানুষের আচরণের মধ্যকার মিল পর্যবেক্ষণ করতেন।

জেন গুডঅল ইন্সটিটিউট

১৯৭৭ সালে জেন গুডঅল আফ্রিকায় তার গবেষণার সুবিধার জন্য জেন গুডঅল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। জেন গুডঅল ইন্সটিটিউটের মূল কাজ ছিলো গম্বি স্ট্রিম জাতীয় পার্কের গবেষণায় সহায়তা করার সাথে সাথে সারা পৃথিবীতে নন-হিউমান রাইটস্ প্রোজেক্টের মাধ্যমে শিম্পাঞ্জি ও নরবানরদের আধিকার নিশ্চিত করা।

জেনের বয়স তখন ৫ কি ৬ বছর

 হঠাৎ একদিন সকালের নাস্তার পর থেকে তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্রতিবেশীদের বাড়িতে খোঁজ নেয়া হয়ে গেলে চিন্তা রূপ নেয় ভয়ে। সর্বদা বাড়ির উঠোনে পোষা প্রাণী নিয়ে খেলা করা শিশুটি কোনো অপহরণকারীর পাল্লায় পড়লো না তো! দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো, বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ১০ ঘন্টা হয়ে এলো, গুডালের কোনো খোঁজ নেই এখনো। সকলের ভেতরের চাপা ভয়টা যখন কান্নায় পরিণত হবার উপক্রম, তখনই নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপটে উপস্থিত গুডাল, হাতে তার একটি মুরগীর ডিম! তার মা মার্গারেট কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?” জেনের এবার বিস্মিত হবার পালা। কারণ, সারাদিন তো সে বাড়ির বাইরেই যায়নি, তাকে নিয়ে এতো ভয় কীসের? “আমি তো মুরগীর ঘরে ছিলাম, মুরগী কীভাবে ডিম পাড়ে তা দেখতেই বসে ছিলাম!

কারো শৈশব সর্বোচ্চ যতটা আনন্দময় হতে পারে, জেন গুডালের শৈশব ততটাই আনন্দময় ছিল। তার বাবা-মা অন্যদের মতো সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়ে, সন্তানকে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত করবার স্বপ্ন কখনোই দেখতেন না। ইচ্ছে হলে খাবো, পড়বো, নয়তো ঘুরে বেড়াবো, খেলবো, পোষা প্রাণীর সাথে খুনসুটি করবো- এভাবেই কেটেছে গুডালের শৈশব। যখন যা চেয়েছেন, তা পেয়েছেন। যখন যা করেছেন, তৃপ্তি সহকারেই করেছেন। শিশুকাল থেকেই পশুপাখির সাথে তার ঘনিষ্ঠতা দেখে তার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে তাকে ‘টারজান’ বলেও ডাকতো! বাড়িতে তার বেশির ভাগ সময়ই কাটতো পোষা কুকুর, বিড়াল আর খরগোশের সাথে খেলা করে। খেলাটা শুধু নিছক খেলাই ছিল না, তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাও ছিল বটে। আর এই শিক্ষা গ্রহণ করতে করতেই তো সেবার মুরগীর ঘরে ঘরে হারিয়ে গেলেন আনমনে!

পশুপাখির প্রতি জেনের আকর্ষণ ছিল এমনই বেশী। তবে একে আকর্ষণের চেয়ে ভালোবাসা বলাটাই অধিক সমীচীন হবে হয়তো। তার পরিবারের সদস্যরা পাঁচ বয়সী জেনের ভবিষ্যৎ সেদিনই কিছুটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আর জেন পেরেছিলেন সম্পূর্ণরূপে। গৃহেই তিনি সেরেছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা। তবে শৈশবে সবচেয়ে বেশি পড়েছেন ডক্টর ডুলিটল, দ্য জাঙ্গল বুক আর টারজানের মতো বই। এই তিনটি বইয়ের নামই কেন উল্লেখ করা হয়েছে ধরতে পারছেন কি? তিনটি বই-ই তো প্রাণ-প্রকৃতির অত্যন্ত নিকটে। আর জেন এসব বই পড়তে পড়তে কল্পনার হাওয়াই জাহাজটা আকাশে উড়িয়ে দিতেন, যা কখনোবা আফ্রিকার কোনো গহীন অরণ্যে, কখনো বা আমাজনের কোনো নির্জন স্থানে গিয়ে ল্যান্ড করতো। সেখানে তিনি নানান প্রজাতির প্রাণীর সাথে খেলা করতেন আর টারজানের মতো বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেন! ভাগ্যিস জেনের স্বপ্নের হাওয়াই জাহাজটা মাঝপথে ক্র্যাশ করেনি!

জেন গুডালই সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি কোনো শিম্পাঞ্জির নামকরণ করেছিলেন মানুষের নামে। অবশ্য গ্রেবিয়ার্ডের প্রতি তার এত ভালোবাসার একটা কারণও রয়েছে। শিম্পাঞ্জি নিয়ে কাজ করতে তিনি যে অভয়ারণ্যে গিয়েছিলেন, সেখানের শিম্পাঞ্জিগুলো মানুষের সাথে একেবারেই মিশতো না। তার উপর প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জিগুলো ছিল ভীষণ শক্তিশালী এবং আক্রমণাত্মক। কিন্তু জেন তাতে ভয় পাননি বিন্দুমাত্র। কারণ তার ভেতরে যে বাস করতো একটি ‘টারজান’! গ্রেবিয়ার্ড নামক শিম্পাঞ্জিটিই জেনকে প্রথম সহজভাবে মেনে নেয় এবং গ্রেবিয়ার্ডের দেখাদেখি জেনের সাথে বন্ধুত্ব করতে এগিয়ে আসে আরো অনেক শিম্পাঞ্জি।

মানুষের সাধারণ জ্ঞান বলে, যেকোনো ধরনের যন্ত্রের নির্মাণ এবং ব্যবহার কেবল মানুষের দ্বারাই সম্ভব। কিন্তু জেনের বন্ধু গ্রেবিয়ার্ড এই ধারণা বিস্ময়করভাবে পাল্টে দিল। বিজ্ঞানমহলে প্রতিষ্ঠিত হলো এক অদ্ভুত সত্য- শিম্পাঞ্জিও যন্ত্র নির্মাণ এবং ব্যবহার করতে পারে! হ্যাঁ, প্রাণীটির এই বিস্ময়কর ক্ষমতা জেন গুডালই প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন। রুটিনমাফিক গ্রেবিয়ার্ডের সাথে দেখা করতে গিয়ে একদিন তিনি লক্ষ্য করেন, উইপোকার ঢিবি থেকে উইপোকা বের করার জন্য অদ্ভুত উপায়ে ঘাসের ব্যবহার করছে প্রাণীটি! চকিত জেন ব্যাপারটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবার জন্য দূরেই দাঁড়িয়ে রইলেন ঠায়। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, শিম্পাঞ্জিটি গাছের পাতা ছিড়ে তা দ্বারা বিশেষ উপায়ে ঢিবি থেকে উইপোকা বের করে নিয়ে আসছে!

শিম্পাঞ্জির সাথে জেন গুডালের জীবনভর সখ্যতার এটা ছিল শুরু। শিম্পাঞ্জির এমন অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে এই প্রাণী নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আরো বহুগুণে বেড়ে যায় তার। শিম্পাঞ্জির যান্ত্রিক ক্ষমতা আবিষ্কারের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন যে, একদল শিম্পাঞ্জি মিলে একটি বানর শিকার করে সেটির মাংস খাচ্ছে। তবে এর চেয়েও মজার একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য তিনি খুঁজে পান এই পশুর মধ্যে। আর তা হচ্ছে, এরা দলবেঁধে থাকতে ভালোবাসে এবং প্রতিটি দলই নিজেদের নির্দিষ্ট পরিমাণ এলাকা দখল করে রাখে। যদি একদলের কোনো সদস্য আরেক দলের এলাকায় প্রবেশ করে, তাহলে সে সদস্যটিকে আটক করে শাস্তি দেয়া হয়। অধিকাংশ সময়ই অনুপ্রবেশকারী শিম্পাঞ্জিটিকে ছেড়ে দেয়া হলেও কখনোবা হত্যাও করা হয়!

জেন গুডালের একজন প্রাণীবিদ কিংবা নির্দিষ্ট করে বললে একজন শিম্পাঞ্জি প্রেমিক হয়ে ওঠার পেছনে ব্যাপকভাবে কাজ করেছে তার ঔদাসীন্য। তার বাবা হার্বার্ট মরিস ছিলেন একজন টেলিফোন ইঞ্জিনিয়ার, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ আর্মির সাথে ফ্রান্সে চলে যান মরিস। তখন জেন সপরিবারে বোর্নমাউথে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।

এ সময় তার বয়স মাত্র ছয় বছর। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন যুদ্ধের বিভীষিকা, দূরে দেখেছেন নাৎসিদের বোমা পড়ছে, শুনেছেন তার বিস্ফোরণের ভয়ানক আওয়াজ, অনুভব করেছেন কম্পন, পত্রপত্রিকায় দেখেছেন মানুষের হাহাকার। এতসব দেখার পর শিশুমনে কেমন করে তা দাগ কাটে তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তার মা মার্গারেট। কিন্তু সব দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে তিনি দেখালেন এক পরম ঔদাসীন্য! এত হানাহানি আর রক্তপাত দেখেও নিজের পোষা প্রাণীদের সাথে দিব্যি সুখী জীবন যাপন করেছেন ছয় বছর বয়সী জেন!

বয়স বাড়ার সাথে জেনের পশুপ্রেমও বাড়তে থাকে। মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রাণপ্রকৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য তিনি একটি ঘরোয়া ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেন ‘এলিগেটর ক্লাব’! ক্লাবের প্রেসিডেন্ট তিনি নিজে এবং সাধারণ সদস্য তার বোন ও দুই বন্ধবীসহ মোট ৩ জন। এই ক্লাবের কার্যক্রম নিয়মিত চলতো, বক্তৃতা হতো, আলোচনা হতো। এসব আলোচনা বা বক্তৃতা জেনই পরিচালনা করতেন এবং ক্লাবের জন্য নিজ হাতে ম্যাগাজিন রচনা করতেন। এই কাজগুলো নিতান্ত শিশুসুলভ হলেও এর গুরুত্ব অন্য জায়াগায়। এই ব্যাপারগুলোই জেনের গভীর পশুপ্রেমের ইঙ্গিতবাহী। দিন বাড়তে থাকে, জীববিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসা বাড়তে থাকে, আর বাড়তে থাকে অন্যান্য বিষয়ের প্রতি অনীহা। সে কারণেই স্কুলজীবনটা খুব একটা ভালো কাটেনি তার।

কলেজে পড়ালেখা শেষে সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে আগ্রহী ছিলেন জেন গুডাল। তিনি ভেবেছিলেন, সাংবাদিক হয়ে জীবিকার্জন করবেন আর অবসর সময়ে নিজের প্রিয় বিষয়ে পড়ালেখা করবেন। কিন্তু তার জীবনের চিত্রনাট্য লেখা ছিল অন্যরকমভাবে। অর্থের অভাবে যেখানে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি, সেখানে নিজের স্বপ্নের আফ্রিকায় ভ্রমণ তো তার জন্য দিবাস্বপ্নেরই সামিল ছিল। ১৯৫৫ সালে সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরের বার্তা বয়ে আনে তার বন্ধুর একটি চিঠি। সে চিঠিতে দু’বছর পর জেনকে কানাডা যাবার আমন্ত্রণ জানানো হয়। জেন সাগ্রহে সে চিঠির উত্তর লিখে পাঠান, তিনি আসছেন। পরবর্তী দুই বছর তিনি অত্যন্ত মিতব্যায়ী হয়ে দিনাতিপাত করেন কেনিয়া যাবার খরচ যোগাতে।

তিন সপ্তাহের জাহাজ ভ্রমণ শেষে, ১৯৫৭ সালের মার্চে কেনিয়ার রাজধানী শহর নাইরোবিতে পৌঁছেন জেন। সেখানে একটি অফিসে চাকরি নেন তিনি। এই চাকরিই মূলত তাকে তার স্বপ্নযাত্রায় গাঁ ভাসাতে সহায়তা করেছিল। কেননা তার অফিসে তার বস ছিলেন বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ লুইস লিকি। জেনের পশুপাখি নিয়ে আগ্রহের কথা জানতে পেরে চমৎকৃত হন লিকি। “শিম্পাঞ্জি হচ্ছে মানুষের একটি প্রাচীন পূর্বপুরুষ।”- চার্লস ডারউইনের এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন লিকি। তিনি তার নিজস্ব যুক্তি দিয়ে জেনকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। এর মাঝে একবার লিকি ও তার স্ত্রীর সাথে তানজানিয়ায় ফসিল নিয়ে গবেষণা করতেও গিয়েছিলেন জেন। সেখানেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নে যে তিনি শিম্পাঞ্জি নিয়ে কাজ করবেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি তানজানিয়ার ‘গোম্বি স্ট্রিম শিম্পাঞ্জি রিজার্ভ’ এ কাজ শুরু করেন।

গোম্বি রিজার্ভে কাজ করেই শিম্পাঞ্জি সম্পর্কিত বেশ কিছু বৈপ্লবিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন জেন। লিকির সহায়তায় তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইথোলজি’ বা প্রাণীর আচরণ বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে যান। ১৯৬৫ সালে ‘বিহেভিয়ার অব ফ্রি রেঞ্জিং শিম্পাঞ্জিস’ শিরোনামে তার গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা তাকে খ্যাতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দুটোই এনে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্যই পরবর্তীতে তিনি একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হন। অবশ্য এর আগেই, ১৯৬৩ সালে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’ তাকে ব্যাক্তিগত গবেষণা করার জন্য অর্থায়ন করে। সেখান থেকে তিনি প্রকাশ করেন ‘মাই লাইফ এমং ওয়াইল্ড শিম্পাঞ্জিস’। পরের বছর তাকে নিয়ে ‘মিস গুডাল অ্যান্ড দ্য ওয়াইল্ড শিম্পাঞ্জিস’ নামক একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ বের করে ন্যাট জিও, যা কিনা ব্যাপক সফলতা লাভ করে।

মৃত্যু: 

১৯৬৪ সালে জেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুগো ভ্যান লাভিককে বিয়ে করেন। ১০ বছর সংসার করার পর হুগোর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান জেন। পরের বছরই বিয়ে করেন ড্যারেক ব্রাইসেশনকে। দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৮০ সালে ড্যারেক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাতে একাকী জেন গুডাল ভেঙে পড়েননি, ভাঙবেনও না আর। তিনি জীবনভর কাজ করেছেন শিম্পাঞ্জি নিয়ে, এখনো করে চলেছেন নিরলসভাবে।

 ‍sourse: wikipedia

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0