স্যর রামানুজান এর জীবনী | Biography of Srinivasa Ramanujan
স্যর রামানুজান এর জীবনী | Biography of Srinivasa Ramanujan
রামানুজন: গণিতের জগতে এক অনন্য প্রডিজি
|
জন্ম |
২২ ডিসেম্বর ১৮৮৭ ইরেভদ, মাদ্রাজ, ভারত
|
|---|---|
|
মৃত্যু |
২৬ এপ্রিল ১৯২০ (বয়স ৩২) চেন্নাই, তামিল নাড়ু, ভারত
|
|
জাতীয়তা |
ভারতীয় |
| মাতৃশিক্ষায়তন |
|
|
পরিচিতির কারণ |
|
|
পুরস্কার |
ফেলো অফ দ্য রয়েল সোসাইটি (১৯১৮) |
|
বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন |
|
|
কর্মক্ষেত্র |
গণিতজ্ঞ |
|
অভিসন্দর্ভের শিরোনাম |
হাইলি কম্পোজিট নম্বর (১৯১৬) |
|
উচ্চশিক্ষায়তনিক উপদেষ্টা |
গডফ্রি হ্যারল্ড হার্ডি জন এডেনসর লিটলউড |
শ্রীনিবাস রামানুজন
(২২ ডিসেম্বর ১৮৮৭ – ২৬ এপ্রিল ১৯২০) অসামান্য প্রতিভাবান একজন ভারতীয় গণিতবিদ। খুব অল্প সময় বাঁচলেও তিনি গণিতে সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে গেছেন। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে গাণিতিক বিশ্লেষণ, সংখ্যাতত্ত্ব, অসীম ধারা ও আবৃত্ত ভগ্নাংশ শাখায়, গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার রেখে যাওয়া নোটবুক বা ডায়েরি হতে পরবর্তীতে আরও অনেক নতুন সমাধান পাওয়া গেছে। ইংরেজ গণিতবিদ জি এইচ হার্ডি রামানুজনকে অয়েলার ও গাউসের সমপর্যায়ের গণিতবিদ মনে করেন। অবিভক্ত ভারতের মাদ্রাজের এক গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান রামানুজন ১০ বছর বয়সে গণিতের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁকে এস এল লোনি লিখিত ‘’’ত্রিকোণমিতি’’’ পুস্তকটি দেওয়া হয় এবং তখন থেকে তিনি গণিতে সহজাত প্রতিভা প্রদর্শন করেন। ১২ বছরের মধ্যে তিনি ওই পুস্তকের বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জন করেন। এমন কি তিনি নিজে কিছু উপপাদ্য আবিষ্কার করেন এবং স্বতন্ত্রভাবে অয়েলারের এককত্ব পুনরাবিষ্কার করেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি গণিতে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়ে পুরস্কার ও প্রশংসা লাভ করেন। ১৭ বছর বয়সে রামানুজন বার্নোলির সংখ্যা ও অয়েলার-মাসেরনি ধ্রুবকের ওপর নিজের গবেষণা সম্পন্ন করেন। কুম্বাকোটম সরকারি কলেজে পড়ার জন্য বৃত্তি পেলেও অ-গাণিতিক বিষয়ে ফেল করার কারণে তার বৃত্তি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি অন্য একটি কলেজে নিজের গাণিতিক গবেষণা শুরু করেন। এই সময় জীবন ধারণের জন্য তিনি মাদ্রাজ বন্দর ট্রাস্টের মহা হিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে কেরানি পদে যোগ দেন।
জন্ম ও বংশপরিচয়
রামানুজন ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ (বতমানে চেন্নাই )প্রদেশের তাঞ্জোর জেলার কাবেরী নদীর তীরে এরোড শহরে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন এরোডের মুন্সেফ কোর্টের এক আমিনের কন্যা। তার পিতা কে শ্রীনিবাস ইয়েঙ্গার ছিলেন শহরের একটি কাপড়ের দোকানের হিসাবরক্ষক। তার মা কোমালাটাম্মাল একজন গৃহিণী ছিলেন এবং একটি স্থানীয় মন্দিরে গান গাইতেন। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন মহিলা। প্রচলিত আছে যে, রামানুজনের মায়ের বিয়ের পর বেশ কয়েকবছর কোন সন্তান না হওয়ায়, রামানুজনের মাতামহ নামাক্কল শহরের বিখ্যাত নামগিরি দেবীর নিকট নিজ কন্যা সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন। এরপরই জ্যেষ্ঠ সন্তান রামানুজন জন্মগ্রহণ করেন।
বাল্যকাল
পাঁচ বছর বয়সে রামানুজনকে পাড়ার পাঠশালায় ভর্তি করা হয়। সাত বছর বয়সে তাকে কুম্ভকোনাম শহরের টাউন হাই স্কুলে ভর্তি করানো হয়। রামানুজন সাধারণত কম কথা বলতেন এবং মনে হতো তিনি কিছুটা ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তার অসাধারণ প্রতিভা স্কুল কর্তৃপক্ষের গোচরে আসে এবং তার প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে বৃত্তি দেওয়া হয়। তিনি বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বিভিন্ন গাণিতিক উপপাদ্য, গণিতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি ও এর মান যে কোন সংখ্যক দশমিক স্থান পর্যন্ত বলতে পারতেন। প্রথমে নিজের এই অদ্ভুত প্রতিভার বিচার তিনি নিজেই করতে পারেননি। তার এক বন্ধু তাকে জি. এস. কার (G S Carr)-এর লেখা সিনপসিস অফ এলিম্যনটারি রেজাল্ট ইন পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেম্যাটিক্স (Synopsis of elementary results in Pure and Applied Mathematics) বইটি পড়তে দেন। মূলত এই বইটি পড়েই তার গাণিতিক প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে। রামানুজন এই বইয়ে প্রদত্ত বিভিন্ন গাণিতিক সূত্রগুলির সত্যতা পরীক্ষা শুরু করেন। তার কাছে এগুলো ছিল মৌলিক গবেষণার মত, কারণ তার কাছে অন্য কোন সহায়ক গ্রন্থ ছিল না।
গবেষণা কর্মের সূচনা
তিনি ম্যাজিক স্কোয়ার গঠনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এরপর তিনি জ্যামিতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর কাজ শুরু করেন। বৃত্তের বর্গসম্পর্কীয় তার গবেষণা পৃথিবীর বিষুবরৈখিক পরিধির দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতিতে নির্ণীত বিষুবরৈখিক পরিধির দৈর্ঘ্য এবং প্রকৃত মানের পার্থক্য মাত্র কয়েক ফুট ছিল। জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে তিনি বীজগণিতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। শোনা যায়, রামানুজন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার নোট বুকে কিছু লিখতেন। কী লিখছেন জিজ্ঞাসা করলে বলতেন যে, নামাক্কলের দেবী স্বপ্নে তাঁকে এই সব সূত্র দিয়ে প্রেরণা দিচ্ছেন। স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত এ সকল সূত্র তিনি পরীক্ষণ করতেন, যদিও তার পরীক্ষা পদ্ধতি খুব আনুষ্ঠানিক ছিলনা।যৌবনকাল
১৬ বছর বয়সে রামানুজন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও জুনিয়র শুভ্রামানায়াম বৃত্তি লাভ করে কুম্ভকোনাম সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু গণিতের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার ফলে পরের পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হন এবং তার বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি কুম্ভকোনাম ত্যাগ করে প্রথমে বিশাখাপত্তনম এবং পরে মাদ্রাজ যান। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ফার্স্ট এক্সামিনেশন ইন আর্টস (F.A. বা I.A.) পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন এবং অকৃতকার্য হন। তিনি আর এই পরীক্ষা দেননি। এরপর কয়েক বছর তিনি নিজের মত গণিত বিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যান।
বিবাহ ও কর্মজীবন
সংসারের কাজকর্ম করেন আর ফাঁকে ফাঁকে চলে গণিতচর্চা। জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেন আর সেগুলো পাঠিয়ে দেন ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে। এ সময় মা চাকরির জন্য চাপ দেন। তখন রামানুজন যোগাযোগ করেন কালেক্টর রামচন্দ্র রাওয়ের সঙ্গে। রামচন্দ্র রামানুজনের গণিতপ্রতিভা দেখে বিস্মিত হন। তিনি রামানুজনকে মাদ্রাজে গিয়ে গণিত নিয়ে গবেষণা করতে বলেন। আর মাসিক ২০ টাকা বৃত্তির একটি ব্যবস্থা করে দেন। ১৯১২ সালে রামানুজন মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি পান। রামানুজনকে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা চিনতেন। গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে খানিকটা পরিচিতিও পেয়েছেন। তাই চাকরি পেতে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। তখন রামানুজনের সহকর্মী এস এন আইয়ার। তিনিও গণিতে দক্ষ ছিলেন। ১৯১৩ সালে আইয়ার রামানুজনের কাজের ওপর ভিত্তি করে ‘অন দ্য ডিস্ট্রিবিউশন অব প্রাইমস’ নামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। লেখাটি পাঠিয়ে দেন এইচ জি হার্ডিসহ আরও কয়েকজন গণিতবিদের কাছে। হার্ডি আগ্রহ দেখালেন। রামানুজন ও হার্ডির মধ্যে বেশ কয়েক দফা চিঠি চালাচালি হলো। রামানুজনকে ইংল্যান্ডে ডেকে পাঠালেন হার্ডি। রামানুজন ব্রাহ্মণের ছেলে। চাইলেই কালাপানি পেরিয়ে যেতে পারবেন না ইংল্যান্ডে। তা ছাড়া তাঁর মা ছেলেকে ছাড়বেন না। হার্ডি রামানুজনের গণিতের দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হলেন। কিছুটা ধন্ধও ছিল তাঁর মনে। কারণ, রামানুজন যেভাবে সমাধান করেছেন সমস্যাগুলোর, এর আগে কেউ সেভাবে করেনি। সুতরাং রামানুজনের গণিত যদি ঠিক হয়, তাহলে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হবে। তাই হার্ডি রামানুজনকে বোঝালেন এবং পত্রিকায় প্রকাশে সাহায্য করার আশ্বাস দিলেন। রাজি হলেন রামানুজন। অবশেষে মায়ের সম্মতিও পাওয়া গেল। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে পৌঁছালেন রামানুজন।
১৯০৯ সালে রামানুজন বিবাহ করেন। কিন্তু তার কোন স্থায়ী কর্মসংস্থান ছিলনা। প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি স্বভাবের বিপরীতে জীবিকা অন্বেষণের চেষ্টা চালাতে থাকেন। এ সময় তার ঘনিষ্ঠ একজন একটি পরিচয়পত্র দিয়ে চাকুরির সুপারিশ করে তাঁকে মাদ্রাজ শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে নেলোর শহরের কালেক্টর দেওয়ান বাহাদুর রামচন্দ্র রাও-এর কাছে প্রেরণ করেন। রামচন্দ্র রাও গণিতের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। রামানুজনের দুটি নোটবুক তার সকল গাণিতিক সূত্রের প্রতিপাদ্য ও এ-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় লিপিবদ্ধ ছিল। রামানুজন সম্পর্কে রামচন্দ্র রাও নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। নিচে কিছুটা তুলে ধরা হলো,
কয়েক বছর আগে, কোনরকম গাণিতিক বিষয়ে উৎসাহ নেই এরূপ, আমার এক ভাইপো আমাকে একদিন জানালো, তার কাছে একজন অভ্যাগত আছেন যিনি গণিত বিষয়ে কথা বলেন এবং আমার ভাইপো তার কথাবার্তা বুঝতে পারছে না। আমার ভাইপোর অনুরোধে এবং আমার গাণিতিক বিষয়র উৎসাহের কারণে আমি রামানুজনকে আমার সামনে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিলাম। একটু বেঁটে কিন্তু বলিষ্ঠ, খোঁচা দাড়িবিশিষ্ট, সাদাসিধে চেহারার বুদ্ধিদীপ্ত চক্ষুবিশিষ্ট রামানুজন নোটবুক হাতে আমার সামনে এলেন। তার হাতে নোটবুক দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে বারবার ব্যবহারে নোটবুকের রঙ যেমন হালকা হয়েছে তেমনি বিবর্ণও হয়েছে। তিনি কুম্ভকোনাম থেকে পালিয়ে মাদ্রাজ এসেছেন বিশ্রাম নিতে এবং বিশ্রামের অবসরে তার অনুশীলন চালিয়ে যাবেন। তিনি কোন যশ বা খ্যাতি প্রার্থনা করেন না। তিনি কেবল বিশ্রাম চান, অর্থাৎ বিনা উদ্যোগে তিনি সামান্য খাদ্য চান যাতে তিনি তার স্বপ্নের সাধনা চালিয়ে যেতে পারেন।
তিনি খাতা খুলে তার আবিষ্কৃত কিছু বিষয় আমার কাছে ব্যাখ্যা শুরু করলেন এবং আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম যে তার বক্তব্য খানিকটা গতানুগতিক ধারা বহির্ভূত; কিন্তু আমার সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমি বুঝতে অসমর্থ হই যে তার বক্তব্য সঠিক না ভ্রান্ত। তাই কোনরূপ সিদ্ধান্ত প্রদান না করে আমি তাকে পুনরায় আসতে বলি এবং তিনি আসেন। তিনি আমার জ্ঞানের পরিধি বুঝতে পারেন এবং তিনি কিছু সহজতর বিষয় আমার নিকট ব্যাখ্যা করেন। তার ব্যাখ্যা তৎকালীন অনেক পাঠ্যপুস্তক অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ছিল এবং তিনি যে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি এ সম্পর্কে আর কোন সন্দেহ রইলো না। অতঃপর তিনি ধাপে ধাপে উপবৃত্তিক যোগজ (elliptic intergal) এবং অধিজ্যামিতিক ধারা (Hypergeometric series) আমার নিকট ব্যাখ্যা করেন এবং সর্বশেষ তার অপসারী ধারা তত্ত্ব (Theory of divergent series) যা এখনও জগতবাসীর নিকট অজ্ঞাত, আমাকে অভিভূত করে। আমি তার কাছে জানতে চাই, তিনি কী চান। তিনি জানান যে, কোনরকম সামান্যভাবে গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত একটি ব্যবস্থা হলে তিনি তার গবেষণা চালিয়ে যেতে পারেন।
রামচন্দ্র রাও কিছুদিনের জন্য রামানুজনের সকল ব্যয়ভার বহন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু তার জন্য কোন বৃত্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় এবং রামানুজন দীর্ঘকাল অপরের গলগ্রহ হয়ে থাকতে সম্মত না হওয়ায় তিনি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে একটি সামান্য পদের চাকুরিতে যোগদান করেন। কিন্তু তার গবেষণা কর্ম এসবের জন্য কখনো ব্যহত হয়নি। পোর্ট ট্রাস্টে কাজ করার সময় কিছু লোকের সাথে তার পরিচয় হয় যারা তার নোটবুক নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন। এর সূত্র ধরে গণিত বিষয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সাথে তার যোগাযোগ হয়। ১৯১১ সালে তার প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ Journal of the Mathematical Society পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংখ্যাতত্ত্বের উপর তার গবেষণালব্ধ Some Properties of Bernoulli's Numbers নামে তার প্রথম দীর্ঘ প্রবন্ধ একই বছর প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে একই পত্রিকায় তার আরো দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং সমাধানের জন্য কিছু প্রশ্নও প্রকাশিত হয়।
প্রতিভার স্বীকৃতি
রামচন্দ্র রাও মাদ্রাজ প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের মি. গ্রিফিথ-কে রামানুজনের ব্যাপারে বলেন। মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং-এর সঙ্গে মি. গ্রিফিথ এর আলাপ হওয়ার পর থেকেই রামানুজনের প্রতিভার স্বীকৃতি শুরু হয়। মাদ্রাজ শহরের বিশিষ্ট পণ্ডিত শেশা আইয়ার এবং অন্যান্যদের পরামর্শে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ফেলো জি.এইচ. হার্ডির সঙ্গে রামানুজন যোগাযোগ শুরু করেন এবং তার বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে ইংরেজি ভাষায় একটি পত্র লেখেন। এই পত্রের সঙ্গে ১২০ টি উপপাদ্য সংযোজিত ছিল, তার ভিতর থেকে নমুনাস্বরূপ হার্ডি ১৫টি নির্বাচন করেন। হার্ডি মন্তব্য করেন
এরপর হার্ডি ওই ১২০ টির মধ্যে কয়েকটি ইতিপূর্বে অন্য কোন গণিত বিশারদ প্রমাণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
একজন সাধারণ পেশাদার গণিত বিশারদ হিসেবে একজন অপরিচিত হিন্দু কেরানির নিকট হতে পত্রপ্রাপ্তির পর আমার প্রতিক্রিয়া দিয়েই আপনার প্রতি আমার বক্তব্য শুরু করতে চাই।
তবে এগুলি দেখলেই বোঝা যায় যে কেবলমাত্র একজন তীক্ষ্ম মেধাসম্পন্ন গণিতবিদের পক্ষেই এগুলো লেখা সম্ভব। এগুলো সবই সঠিক, কারণ সঠিক না হলে এগুলো আবিষ্কার মত ইচ্ছা কারুরই হত না। সবশেষে লেখক নিশ্চয়ই সৎ, কারণ খ্যাতনামা গণিতবিদ চোর বা হামবাগ অপেক্ষা অনেক সাধারণ মানুষ হয়।
একটি গাণিতিক পদের জন্য ব্যবহৃত প্রতীক (notation) ১৯০৮ সালে এডমুন্ড ল্যান্ডাউ প্রথম উদ্ভাবন করেন। ল্যান্ডাউয়ের মত এত কিছু রামানুজনের ছিলনা। তিনি ফরাসী বা জার্মান ভাষায় কোন পুস্তক কখনো দেখেন নি, এমন কি ইংরেজি ভাষায় তার জ্ঞান এত দুর্বল ছিল যে কোন ডিগ্রির জন্য কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াও তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তিনি এমন কিছু বিষয় ও সমস্যার উপস্থাপনা করেছেন যা ইউরোপের অসামান্য প্রতিভাধর বিজ্ঞানীরা ১০০ বছর ধরে সমাধান করেছেন- এমন কি কিছু এখনো সমাধান হয়নি।
ইংল্যান্ড যাত্রা
অনেকদিন ধরে হার্ডি রামানুজনকে ইংল্যান্ড নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। রামানুজনের অনেক বন্ধু ও হিতৈষীর প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালের মে মাসে মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের কেরানির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং একটি বৃত্তি মঞ্জুর করা হয়। ঠিক এমনি সময়ে তিনি কেমব্রিজ থেকে একটি আমন্ত্রণ পান। চাকুরিগত সমস্যার সমাধান হলেও জাতিপ্রথা ও মায়ের অনুমতির অভাবে প্রথমে রামানুজন দেশের বাইরে যেতে অসম্মতি জানান। হার্ডি লিখেছেন,
অবশেষে অপ্রত্যাশিতভাবে সহজেই মায়ের সম্মতি পাওয়া যায়। একদিন সকালে রামানুজনের মা সকলকে জানান যে গতরাত্রে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন যে, তার পুত্র যেন একটি হল ঘরে ইউরোপিয়ানদের সাথে একত্রে বসে আছে এবং নামগিরি দেবী তাঁকে ছেলের জীবনের আশা পূরণে কোনরূপ বাধা না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
কেমব্রিজ এর আমন্ত্রণে বিদেশে আসার অল্পদিন পরই রামানুজন ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেয়ে যান। এই সময় মাদ্রাজ থেকে প্রাপ্ত বৃত্তির পরিমাণ ছিল বার্ষিক ২৫০ পাউন্ড; তার ৫০ পাউন্ড দেশে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য দিতে হত। এছাড়া ট্রিনিটি কলেজ থেকে ভাতা বাবদ ৫০ পাউন্ড পেতেন। রামানুজন সম্পর্কে হার্ডি লিখেছেন,
আরো একটি বড় অসুবিধা ছিল। কীভাবে তাকে আধুনিক গণিত শেখানো যায়? তার জ্ঞানের সীমা ও গভীরতা সমভাবে চমকপ্রদ ছিল। Modular সমীকরণ, যে কোন অশ্রুতপূর্ব মাত্রার জটিল রাশির গুণফলের তত্ত্ব, অবিরত ভগ্নাংশ প্রভৃতি বিষয়ে তার পারদর্শিতা পৃথিবীর যে কোন গণিতবিদ অপেক্ষা বেশি ছিল। আবার তিনি দ্বিপর্যায়ী ফাংশন (doubly periodic function) বা কচির উপপাদ্যের কথা কখনো শোনেন নি এবং অবাস্তব চলকের ফাংশন সম্পর্কে তার ধারণা অস্পষ্ট। কোন তত্ত্বের গাণিতিক প্রমাণ বলতে কি বোঝায়,সে সম্পর্কে তার আবছা ধারণা যথেষ্ট সমস্যার সৃষ্টি করে। তার প্রতিপাদিত সকল সূত্রই যেন তালগোল পাকানো যুক্তি, যা অন্তর্জ্ঞান বা আরোহ পদ্ধতি ভিত্তিক এবং এগুলো সম্পর্কে কোন সঙ্গত বিবরণ দিতেও তিনি অক্ষম ছিলেন। এমন একটি লোককে ধারাবাহিকভাবে গণিত শিক্ষার পরামর্শ দেওয়াও একপ্রকার অসম্ভব। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে, রামানুজনের নিকট যে বিষয়টি বিরক্তিকর সেই বিষয়ে বেশি জোর দিলে, তার আস্থা নষ্ট হতে পারে যাতে তার প্রেরণার মোহভঙ্গ হতে পারে। অপর পক্ষে এমন কিছু বিষয় ছিল যা সম্পর্কে তার পক্ষে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকাও সম্ভব ছিলনা। তার কিছু সূত্র ভুল ছিল, বিশেষভাবে তিনি মৌলিক সংখ্যা তত্ত্বে বেশি গুরুত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেখানেও অনেক ভুল ছিল। তাকে এই ধারণা নিয়ে থাকতে দেওয়াও সম্ভব ছিলনা যে, zeta ফাংশনের সকল zero ই বাস্তব। সুতরাং আমি তাকে শেখানোর চেষ্টায় কিছুটা সফল হলাম, তবে আমার মনে হয়, আমি তাকে যতটুকু শিখিয়েছি, তার চেয়ে বেশি তার কাছ থেকে শিখেছি।
১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দ, ব্যাসেল শহর, সুইজারল্যান্ড
পড়ন্ত বিকেলে চেয়ার পেতে বাগানে বসে আছেন বেরনুলি পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছেলে জ্যাকব বেরনুলি (Jacob Bernoulli) আর কনিষ্ঠ জোহান বেরনুলি (Johann Bernoulli)। তের বছরের ছোট জোহানকে কোলে পিঠে বড় করেছেন জ্যাকব, শিখিয়েছেন তাঁকে গণিতের নানা রহস্য; শুধু তাই নয়, জোহান এখন পিএইচডি করছেন জ্যাকবেরই তত্ত্বাবধানে। চিন্তা-ভাবনায় তুখোড় জোহান, তবে আদরে আদরে পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানদের ক্ষেত্রে যা হয়—এই বয়সেও প্রচণ্ড একরোখা রয়ে গেছেন। গবেষণা, পড়াশোনা নিয়ে প্রায়ই তীব্র ঝগড়া বেঁধে যায় দু'ভাইয়ের, কথা, এমনকি মুখ দেখাদেখিও, বন্ধ থাকে বেশ কিছুদিন।
আজকে অবশ্য দু'জনের মেজাজ কিছুটা ফুরফুরে। বাগানে বসে নানা মজা করছেন দু'ভাই, খোঁচাচ্ছেন একে অপরকে বেশ। কিছুক্ষণ পর জোহান বেরনুলি একটি কৌতুক বললেন:
পানীয় কেনার জন্য একদা অসীম সংখ্যক গণিতবিদ আসলো এক দোকানে।
"আমাকে ১ ইমমি (তরলের আয়তন পরিমাপকারী প্রাচীন সুইস একক, যা ১.৫ লিটারের সমপরিমাণ) আপেলের রস দিন।" প্রথম জন বলল।
দোকানি তাক থেকে এক ইমমির বোতল নামাতে যাবে, এমন সময় দ্বিতীয় জন বলল, "আমাকে দিবেন এর অর্ধেক, মানে ১/২ ইমমি।"
"আমাকে দেবেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১/৪ ইমমি।" তৃতীয় জন দাঁত বের করে হাসে।
"আমাকে ১/৮ ইমমি।" তীর্যক হেসে চতুর্থ জন দাবি পেশ করে।
গণিতবিদদের লাইনে হাস্যরসাত্মক গুঞ্জনে একের পর এক দাবি উঠতে থাকে; দোকানের মালিক লাইনের দিকে তাকিয়ে শেষ দেখতে পায় না।
"এই দুই বোতল নিয়ে বিদায় হও তোমরা, যত্তসব!" গজগজ করতে করতে এক ইমমির দুইটি বোতল নামিয়ে রাখে বিক্রেতা।
পরস্পরের দিকে হেসে উঠেন জ্যাকব ও জোহান বেরনুলি। এক সাথেই তারা উপলব্ধি করেছেন দোকানি, বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক, ভুল কিছু করেননি, কারণ (১ ইমমি+১/২ ইমমি+১/৪ ইমমি+১/৮ ইমমি+⋯∞) অসীম এ ধারাটির যোগফল বাস্তবিকই ২ ইমমি। গণিতের অপার সৌন্দর্যের এক নিদর্শন এটি: অসীম সংখ্যক সংখ্যার যোগফল সসীম। নানাভাবেই এটি প্রমাণ করা যায়, যেমন ১+(১/২)+(১/৪)+(১/৮)+⋯∞
সমমানের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক পদগুলো কাটাকাটি করলে, অবশিষ্ট থাকে কেবল প্রথম দু‘টি ১, আর তা থেকে বাদ যাবে অসীম দূরের একটি পদ। সুতরাং ধারাটির যোগফল =(১+১-অসীম দূরের একটি পদ)।
পদগুলো যেহেতু ১/২,১/৪,১/৮,১/১৬,⋯এভাবে ক্রমাগত ছোট হয়ে যাচ্ছে, কাজেই অসীম দূরের পদটির কথা চিন্তা করলে, তা এতই ছোট হবে যে একেবারে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। ফলে ধারাটির চূড়ান্ত যোগফল পাওয়া যায় ২।
এটি বিপরীত দিক থেকেও ভাবা যায়। ধরা যাক, একজন লোকের ২ ফুট লম্বা একটি লাঠি রয়েছে। তিনি এটি সমান দু'ভাগ করলেন। তাহলে
২=১+১
লোকটি তারপর প্রথম ভাগটিকে ঠিক রেখে দ্বিতীয় ভাগটিকে আবার সমান দু'ভাগে ভাগ করলেন। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি
২=১+(১/২+১/২)
লোকটি দ্বিতীয় ১/২'কে আবার সমান দু‘ভাগে ভাগ করতে পারেন এভাবেঃ ১/২=১/৪+১/৪
ফলে ২=১+১/২+(১/৪+১/৪)
এভাবে ক্রমাগত ভাগ করে গেলে দেখা যায়,
২=১+১/২+১/৪+১/৮+⋯∞
সুতরাং আলোচ্য অসীম ধারাটি আসলে ২'কে নিরন্তর ভাগ করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। কতই না সুন্দর গণিত—সসীমের ভেতর লুকিয়ে অসীম!
এবার বড় ভাই জ্যাকব বেরনুলি একটি কৌতুক বললেন:
অসীম সংখ্যক থেলার (ব্যাসেল শহরে প্রচলিত প্রাচীন মুদ্রা) পুরস্কার, এ ঘোষণা দিয়ে লটারির আয়োজন করেন এক গণিতবিদ। অবিশ্বাস্য পুরস্কারটিতে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতে থাকে, কিন্তু লটারির টিকেট মাত্র ১০ থেলার হওয়ায় অভূতপূর্ব টিকেট বিক্রি হয়। যথারীতি ফল ঘোষণার পর বিজয়ী ব্যক্তি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তার পুরস্কার আনতে যায়। গণিতবিদ তখন থেলার পরিশোধের শর্তটি তার কাছে ব্যাখ্যা করেন: "আজকে ১ থেলার, আগামিকাল ১/২ থেলার, পরশু ১/৩ থেলার, তার পরদিন ১/৪ থেলার...!"
ধর্মীয় জীবন
তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু। ধর্মীয় অনুশাসন পালনে তিনি যথেষ্ট কঠোরতা অবলম্বন করতেন। তার মতে, পৃথিবীর সব ধর্মই কমবেশি সত্য। তিনি নিরামিষভোজী ছিলেন। তিনি যতদিন কেমব্রিজ ছিলেন, সবসময় স্বপাক আহার করতেন এবং বাইরের পোশাক পরিধান করতেন।
শেষ জীবন
১৯১৭ সালের বসন্তকালের প্রথমে রামানুজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে কেমব্রিজের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়। এরপর তিনি আর কখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন নি। তাকে ওয়েলস, ম্যালটক এবং লন্ডন শহরের স্বাস্থ্যনিবাসে ভর্তি করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর তার শারীরিক কোন উন্নতি দেখা যায়নি। এই সময় রামানুজন রয়েল সোসাইটি-র সদস্য নির্বাচিত হন। গবেষণা কাজে অধিক মনোযোগ দেওয়ার ফলে তার সবচেয়ে মূল্যবান উপপাদ্যগুলো এই সময় আবিষ্কৃত হয়। তিনি নির্বাচিত ট্রিনিটি ফেলো ছিলেন। ১৯১৯ সালে রামানুজন ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। কিছুকাল যক্ষ্মারোগে ভোগার পর ১৯২০ সালের ২৬ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
sourse: wikipedia
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0