কালা জাহাঙ্গীরের জীবনী | Biography of kala Jahangir
কালা জাহাঙ্গীরের জীবনী-biography of kalaJahangir
কালা জাহাঙ্গীর রহস্য!
আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপানো ডন
কটি ফোন কলেই রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল ঢাকার একজন প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর। এসি কামরায় বসেও দরদর করে ঘামতে শুরু করলেন তিনি। প্রচণ্ড আতঙ্কিত অবস্থায় পরদিন সব জানালেন সহকর্মীদের। কালা জাহাঙ্গীরের নাম করে কারা যেন বিশাল অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছে তার কাছে, না দিলে পরিবার সহ মেরে ফেলার হুমকি। কালা জাহাঙ্গীরের নামটি শোনার সাথে সাথে পুরো রুমটিতে যেন বাজ পড়ল। তুমুল বিতর্ক শুরু হয়ে গেল সবার মধ্যে।
কেউ বলছে “কালা জাহাঙ্গীর তো সেই ২০০৪ সালেই খুন হইছে পিচ্চি হান্নানের হাতে। ওর দল আসলো কই থেকে?” বিরোধিতা করল অন্য একজন, “না খুন হয়নি। আত্মহত্যা করছেন কালা জাহাঙ্গীর।” আরেকজন আবার উড়িয়ে দিল তার মরার খবরটিকেই, বলল “আরে! কালা জাহাঙ্গীর এখনো বহাল তবীয়তেই আছেন ভারতে। পুলিশকে ধোঁকা দেয়ার জন্যই ছড়িয়েছেন এসব মৃত্যু সংবাদ। সেখান থেকে এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড।” বিভিন্ন জনের কাছ থেকে উঠে এলো এমন আরো অনেক গল্প। কিন্তু নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না কেউই।
উপরের ঘটনাটি কাল্পনিক হলেও সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। ঢাকাই অন্ধকার জগতের এককালের শিরোমণি কালা জাহাঙ্গীর বস্তুত এক রহস্যময় ‘কিংবদন্তী’ হয়েই আছেন এখনো। আদৌ জীবিত আছেন নাকি মরে গেছেন এ বিষয়ে নিশ্চিত নন কেউই। নিশ্চিত নয় পুলিশও। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে এখনো সবার প্রথমে ভেসে আসে তার নাম। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে। একমাত্র সম্বল কালা জাহাঙ্গীরের আঠারো বছর আগেকার একটি ছবি। আর তার এ রহস্যময়তাকে পুঁজি করে এখনো বিভিন্ন চক্র তার নাম বেচে খাচ্ছে।
ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর কোনো মিথ নয়
১৯৯৩-৯৪ সাল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। এক বিকালে পুলিশ হলের চারদিক ঘিরে ফেলে। খোঁজ নিয়ে জানলাম হলে পুলিশের অভিযান চালানো হবে। অনেক উৎসুক ছাত্রের মতো আমিও বেরিয়ে আসি হলের প্রধান ভবনের নিচতলার বারান্দায়। এরই মধ্যে একটি ছেলেকে প্রধান ফটকের দিক থেকে মেইন বিল্ডিংয়ের পশ্চিম পাশের বর্ধিত ভবনের দিকে হনহন করে হেঁটে চলে যেতে দেখলাম।ছেলেটি শ্যামলা, ছিপছিপে গড়নের। লম্বা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির মতো হবে। মুখটা একটু লম্বাটে ধরনের। কেউ একজন ফিস ফিস করে বললো- “ঐ যে কালা জাহাঙ্গীর যায়।”
তখন ঢাকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আনাগোনা ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হলে। তাই অবাক হলাম না। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ হলের ভিতরে প্রবেশ করলো। শুরু করলো বিভিন্ন রুমে তল্লাশি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক তল্লাশি চালানোর পর পুলিশ ফিরে যায় খালি হাতে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর ছাত্রদের মধ্যে শুরু হয় কানাঘুষা। কালা জাহাঙ্গীর কীভাবে তার উপস্থিত বুদ্ধির মাধ্যমে নিশ্চিত গ্রেপ্তার এড়িয়েছে সবাইকে চমকে দিয়েছিলো।
পুলিশি তল্লাশির সময় যখন ছাত্ররা রুম থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়, তখন কালা জাহাঙ্গীর হলের এক রুমে প্রবেশ করে। শুয়ে পড়ে লেপ মুড়ি দিয়ে। এমন একটা ভান করে যেনো সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছে। পুলিশ যখন তার লেপ উঠিয়ে পরিচয় জানতে চায়, সে বলে- “স্যার, আমি অনেক অসুস্থ। উঠে দাঁড়াতে পারছি না। তাই শুয়ে আছি।”
১৯৯৭ সালের পর ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান এর সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তারপর মাঝেমধ্যেই কালা জাহাঙ্গীর এর সাথে পিচ্চি হান্নানের নিয়ন্ত্রিত কারওয়ানবাজার তেজতুরী বাজার এলাকায় যৌথ মহড়া দিতো এবং এই এলাকায় কালা জাহাঙ্গীর ও পিচ্চি হান্নান যৌথভাবে অনেক সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে জানান তেজতুরী বাজার এলাকায় এক দোকানদার। ওই দোকানি যিনি ১৯৮৬ সাল থেকে এই এলাকায় ব্যবসা করেন তিনি বলেন, কালা জাহাঙ্গীরসহ অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আস্তানা ছিলো এই ফার্মগেট, তেজতুরী বাজার এলাকায়।
মা জানতেন, কালা জাহাঙ্গীর মারা গেছে
খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘুমোতে যাব, হঠাৎ বেল বাজল। একবার-দুবার নয়, বেজেই চলেছে। মেয়েকে বললাম, দেখ তো মা, এত রাতে কে এল? মেয়ে বলল, মনে হয় পুলিশ। মেয়ে দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে চার-পাঁচজন ঘরে ঢুকে পড়ল। আমার বাড়িতে প্রায়ই পুলিশ আসে। মনে করলাম, এবারও এল। সবাই সাদা পোশাকে। কারও হাতে কোনো অস্ত্র নেই। সবাই নিজেদের পুলিশ বলেই পরিচয় দিল। তল্লাশি-টল্লাশি না করে বলল, আমাদের সঙ্গে চলেন। করলাম, তারা বলল কোনো কথা হবে না। যা বলছি শোনেন, যেতে হবে। যে কাপড়ে ছিলাম বের হলাম। বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখি গলির মোড়ে একটি মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে, তাতে আরও কয়েকজন বসে।
আমাকে সেই গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে থাকল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা থামল একটা উঁচু ভবনের পেছনে। দেখি একটু দূরে আরেকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। বলল, ওই গাড়িতে গিয়ে বসেন। সেটা ছিল প্রাইভেট কার। গাড়ির সামনে একজন বসা। পেছনের সিট খালি। আমি গিয়ে সেই গাড়িতে বসতেই গাড়িটা চলতে শুরু করল, পেছনে সেই মাইক্রোবাস। দুটি গাড়ি এসে থামল একটি বস্তির সামনে। আমাকে বলল বস্তির ভেতরে যেতে হবে।এতক্ষণ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু এত রাতে অন্ধকার বস্তি দেখে খুব ভয় হলো। কি-না-কি হয় বুঝতে পারছি না। কিন্তু যুবকেরা আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করছে। তারা আমাকে বস্তির একটি ঘরে নিয়ে গেল।
সেখানে চাদর দিয়ে একটি মৃতদেহ ঢাকা। একজন চাদর তুলে বলল, দেখেন তো চিনতে পারেন কি না? মুখটা দেখেই চিনলাম। আরও নিশ্চিত হতে বললাম, ডান হাতটা দেখান। তারা ডান হাত দেখাল।ডান হাতের ওপরে একটি নীলাভ জন্মদাগ ছিল। সেটা দেখেই বুঝলাম এটা আমার ছেলের লাশ। আমি ডুকরে কেঁদে উঠে বললাম, এটা আমার ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর। লাশ শনাক্তের পর ওরা আমাকে আর দাঁড়াতে দিল না। আবার সেই গাড়িতে তুলে বাড়ির গেটে নামিয়ে দিয়ে গেল। আর বলে গেল, সবাই আমার ছেলের দলের লোক। এ নিয়ে আমি যেন কোনো বাড়াবাড়ি না করি, থানা-পুলিশ না করি। ২০০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর, সেদিন সোমবার ছিল। এরপর আমি কিছু জানি না, শুনেছি লাশ সেখানেই দাফন করা হয়েছে।
২০০৩-০৪ সালের মধ্যে তাদের অনেকেই খুন হন। আর লাপাত্তা হয়ে যায় কালা জাহাঙ্গীর। এখনও অজানা যে এই সন্ত্রাসী কি অন্তর্কোন্দলে মারা গেছে, গুম হয়েছে নাকি অন্যান্য সন্ত্রাসীদের মতো পাড়ি জমিয়েছে সীমান্তের ওপারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0