আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এর জীবনী | Biography of Ernest Rutherford

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এর জীবনী | Biography of Ernest Rutherford

May 14, 2025 - 19:37
May 16, 2025 - 20:12
 0  1
আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এর জীবনী | Biography of Ernest Rutherford

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এবং পারমাণবিক রসায়নের গতিপথ পাল্টে দেওয়া স্বর্ণপাত পরীক্ষা:

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, নেলসনের প্রথম ব্যারন রাদারফোর্ড:

 (৩০ আগস্ট, ১৮৭১ – ১৯ অক্টোবর, ১৯৩৭), একজন নিউজিল্যান্ডীয় নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের "জনক" হিসেবে খ্যাত।  তিনি তার বিখ্যাত স্বর্ণপাত পরীক্ষায় পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রীণ থেকে রাদারফোর্ড বিক্ষেপণ আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে বোরের পরমাণু মডেল নির্মাণে সহায়ক হয়। ১৯০৮ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।[] তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ছিলেন।

জীবনচরিত: 

প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ছিলেন কৃষক জেমস রাদারফোর্ড এবং তার স্ত্রী মার্থা থম্পসনের ছেলে, মূলত হর্নচার্চ, এসেক্স, ইংল্যান্ড থেকে। জেমস স্কটল্যান্ডের পার্থ থেকে নিউজিল্যান্ডে চলে এসেছিলেন। জন্ম নিউজিল্যান্ডের নেলসনের কাছে ব্রাইটওয়াটারে। যখন তার জন্ম নিবন্ধিত হয়েছিল তার প্রথম নাম 'আর্নেস্ট' রাখা হয়েছিল। রাদারফোর্ডের মা মার্থা থম্পসন ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক।

তিনি হ্যাভলক স্কুল এবং তারপর নেলসন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং নিউজিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টারবারি কলেজে পড়াশোনা করার জন্য একটি বৃত্তি অর্জন করে। 

রাদারফোর্ডের জীবনকাল

আর্নেস্ট রাদারফোর্ডকে বলা যায় পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের রাজা। বেতারতরঙ্গ সম্প্রচার ও সংগ্রহের একদম প্রথমদিকের গবেষণা শুরু হয়েছিল যাদের হাত দিয়ে রাদারফোর্ড তাদেরই একজন। হেনরিখ হার্জ বেতার তরঙ্গ গবেষণার প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন ১৮৮৭ সালে। রাদারফোর্ড বেতারতরঙ্গ প্রেরক (ট্রান্সমিটার) এবং গ্রাহকযন্ত্র (রিসিভার) উদ্ভাবন করেছিলেন ১৮৯৩ সালে। ১৮৯৫ সালে এক্স-রে আবিষ্কৃত হবার পর তিনি তেজস্ক্রিয় বিকিরণের গবেষণায় মনোযোগী হন। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইলেকট্রন আবিষ্কারে। রাদারফোর্ড আবিষ্কার করেন আলফা, বেটা এবং গামা রেডিয়েশন। পরমাণুর প্রোটন এবং নিউক্লিয়াস রাদারফোর্ডেরই আবিষ্কার। পরমাণুর নিউট্রনও আবিষ্কৃত হয় তাঁর তত্ত্বাবধানে তাঁর ছাত্র চ্যাডউইকের হাতে।

আপাদমস্তক পদার্থবিজ্ঞানী রাদারফোর্ড তাঁর আলফা ও বেটা বিকিরণের গবেষণার জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন রসায়নে। তিনি মনে করতেন রসায়নে তাঁর দক্ষতা খুব বেশি নেই। তাই রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর তিনি নিজে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। নীলস বোরের পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেল আবিষ্কৃত হয়েছে রাদারফোর্ডের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। পরবর্তীতে রাদারফোর্ডের ছাত্রদের মধ্যে ১১ জন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

রাদারফোর্ডের জীবনের কিছু মাইলফলক নিচে তালিকাবদ্ধ করা হলো:

· ১৮৭১, ৩০ আগস্ট: নিউজিল্যান্ডের নেলসন রাজ্যের স্প্রিং গ্রোভে (বর্তমানে ব্রাইটওয়াটার) রাদারফোর্ডের জন্ম।

· ১৮৭৭: তাদের পরিবার স্প্রিং গ্রোভ থেকে ফক্সহিল সাবার্বে চলে যায়।

· ১৮৭৭ – ১৮৮৩: ফক্সহিল প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া।

· ১৮৮৩: আবার বাসস্থান পরিবর্তন। মার্লবরো সাউন্ডসের হেভলকে চলে যান তাঁরা।

· ১৮৮৩ – ১৮৮৬: হেভলক স্কুলে লেখাপড়া।

· ১৮৮৩: ছোটভাই পারসি হুপিং কাশিতে মারা যায়।

· ১৮৮৬: বড় দুইভাই হারবার্ট ও চার্লস মার্লবরো সাউন্ডস-এর পানিতে ডুবে মারা যায়।

· ১৮৮৭: মার্লবরো স্কলারশিপ নিয়ে নেলসন কলেজে ভর্তি হলেন।

· ১৮৮৭ – ১৮৮৯: নেলসন কলেজে পড়াশোনা।

· ১৮৮৯: ইউনিভার্সিটি অব নিউজিল্যান্ডের জুনিয়র স্কলারশিপ অর্জন।

· ১৮৯০ – ১৮৯৪: ইউনিভার্সিটি অব নিউজিল্যান্ডের কেন্টারবারি কলেজে লেখাপড়া।

নিউক্লিয়ার ফিজিকসের স্থপতি

পরমাণুর নিউক্লিয়াস কে আবিষ্কার করেছেন? প্রোটন কে আবিষ্কার করেছেন? আলফা, বিটা, গামা রেডিয়েশন কে আবিষ্কার করেছেন? কার হাত ধরে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন শাখা নিউক্লিয়ার ফিজিকসের পথচলা শুরু হয়েছিল সেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে? তেজস্ক্রিয়তার প্রথম এককের নাম কী ছিল? এ রকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর হলো রাদারফোর্ড। সর্বকালের সেরা তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে সর্বকালের সেরা পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড।

আশ্চর্য হলেও সত্য, রাদারফোর্ড হতে চেয়েছিলেন স্কুলশিক্ষক। নিউজিল্যান্ডের কোনো সাধারণ স্কুলে পড়ানোর জন্য তিনবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। সেই রাদারফোর্ড অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন এত বড় বিজ্ঞানী, যিনি পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও ১৯০৮ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন রসায়নে, তেজস্ক্রিয়া বিকিরণ–সংক্রান্ত গবেষণার জন্য। পরে আরও দুটি নোবেল পুরস্কার তিনি পেতে পারতেন প্রোটন কিংবা নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের জন্য। তাঁর প্রায় দুই ডজন গবেষক-ছাত্র এবং গবেষণা-সহযোগীর মধ্য থেকে পরবর্তীকালে ১১ জন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে।

 [ফ্রেডেরিক সডি—রসায়ন ১৯২১, নীলস বোর—পদার্থবিদ্যা ১৯২২, জেমস চ্যাডউইক—পদার্থবিদ্যা ১৯৩৫, জর্জ ডি হেভেসি—রসায়ন ১৯৪৩, অটো হ্যান—রসায়ন ১৯৪৪, এডওয়ার্ড অ্যাপ্লেটন—পদার্থবিদ্যা ১৯৪৭, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট—পদার্থবিদ্যা ১৯৪৮, সিসিল পাওয়েল—পদার্থবিদ্যা ১৯৫০, আর্নেস্ট ওয়াল্টন—পদার্থবিদ্যা ১৯৫১, জন কক্ক্রফট—পদার্থবিদ্যা ১৯৫১, পিয়ত্র ক্যাপিৎসা—পদার্থবিদ্যা ১৯৭৮]

পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখার নাম আমরা এখন নিউক্লিয়ার ফিজিকস হিসেবে জানি, সেই শাখার উৎপত্তি হয়েছে রাদারফোর্ডের নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। পরমাণুর প্রধান উপাদানগুলোর আবিষ্কারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন রাদারফোর্ড। ইলেকট্রনের আবিষ্কারক টমসন ছিলেন রাদারফোর্ডের গবেষণা-শিক্ষক। রাদারফোর্ড আবিষ্কার করেছেন প্রোটন এবং নিউক্লিয়াস, তাঁর ছাত্র চ্যাডউইক আবিষ্কার করেছেন নিউট্রন। নিউক্লিয়ার ফিজিকসের জনক বলা হয় রাদারফোর্ডকে। আধুনিক বিজ্ঞানের জগতের এই মহানায়ক রাদারফোর্ড ছিলেন একজন চাষির ছেলে, যাঁর শৈশবের বেশির ভাগ কেটেছে নিউজিল্যান্ডের এক অখ্যাত গ্রামে।

রসায়নের গতিপথ পাল্টে দেওয়া 

আমি রাদারফোর্ডের মতো উদ্যোগী এবং মৌলিক গবেষণার জন্য আগ্রহী, দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি!”

– জে.জে থমসন

২৪ বছর বয়সী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, ১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ পৌঁছেন বিখ্যাত পদার্থবিদ জে. জে থমসনের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে। পি.এইচডি ডিগ্রির জন্য থমসনের সাথে গবেষণা চালানোর পাশাপাশি তিনি বেতার তরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র (যা পরবর্তীতে রেডিও নামে পরিচিত হয়) তৈরির কাজ শুরু করেন। সে সময়টাতে আরো অনেকেই গ্রাহক যন্ত্র তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। এরই মাঝে রাদারফোর্ড বিশ্বকে তাক লাগিয়ে, আধা মাইল পর্যন্ত দূরত্বে বেতার তরঙ্গ ধরতে সক্ষম এক গ্রাহক যন্ত্র তৈরি করে ফেলেন। তবে তার এই সাফল্যের মাত্র কয়েক মাসের মাথায়ই, রেডিও সংক্রান্ত সবটুকু আলো নিজের দিকে টেনে নেন গুগলিয়েলমো মার্কনি। আর রেডিও তৈরির প্রতিযোগিতা থেকে আরো অনেকের মতোই ছিটকে পড়েন রাদারফোর্ড।

রেডিও তৈরির প্রতিযোগিতায় হারের ক্ষতটা দগদগে থাকতেই নিজের গবেষণায় পূর্ণ মনোযোগ দেন রাদারফোর্ড। থমসনের সাথে গবেষণা শেষ করেছিলেন ১৮৯৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ। থমসন এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অন্যান্য গবেষকগণ, সকলেই বিস্ময়াভিভূত হয়েছিলেন তার অসাধারণ এক গবেষণায়। এই গবেষণার জন্য ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হবারও সুযোগ হয়েছিল তার। তবে, জীবনে প্রথমবারের মতো আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হয়ে হেরে যাওয়ার কষ্ট ভোলানোর জন্য তো আরো বড় কিছু করা চাই। কী করা যায়?

১৮৯৮ সালে ইউরেনিয়ামের বিকিরণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন রাদারফোর্ড। সিদ্ধান্ত নিলেন, তেজস্ক্রিয়তা নিয়েই মৌলিক কাজ করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারই হয়ে গেল তার ঘর। ক্লাস থেকে গবেষণাগার, গবেষণাগার থেকে ক্লাস, এই রুটিনেই কাটতে থাকে তার দিনকাল। আর এভাবে পরিশ্রম করলে, সাফল্য কি না ধরা দিয়ে পারে?

মৃত্যু: 

সামান্য একটি হার্নিয়া চিকিৎসা না করানোর ফলে বৃহৎ আকার নেয়। পরবর্তীকালে লন্ডনে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করার পরে ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর মাত্র ৬৬ বছর বয়সে কেমব্রিজে রাদারফোর্ডের মৃত্যু হয়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0