আন্তনি লরেন্ট ল্যাভয়সিয়ার এর জীবনী | Biography of Antoine Lavoisier
আন্তনি লরেন্ট ল্যাভয়সিয়ার এর জীবনী | Biography of Antoine Lavoisier
ল্যাভয়সিয়ে: বিপ্লবী উন্মাদদের গিলোটিনে প্রাণ হারানো এক প্রতিভাধর রসায়নবিদের গল্প
| জন্ম | ২৬ আগস্ট ১৭৪৩ প্যারিস, ফ্রান্স
|
|---|---|
|
মৃত্যুর কারণ |
গিলোটিন দ্বারা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত |
|
সমাধি |
পিকপুস সমাধিস্থল |
|
মাতৃশিক্ষায়তন |
কোলেজ দে কাত্র-নাসিওঁ, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় |
|
পেশা |
রসায়নবিদ |
| পরিচিতির কারণ |
|
|
বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন |
|
|
কর্মক্ষেত্র |
জীববিজ্ঞানী, রসায়নবিদ |
|
উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী |
এলোতের ইরেনে দু পোঁ |
|
যাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন |
গিইয়োম-ফ্রঁসোয়া রুয়েল, এতিয়েন কোঁদিইয়াক |
| মৃত্যু | ৮ মে ১৭৯৪ (বয়স ৫০) প্যারিস, ফ্রান্স
|
অঁতোয়ান-লোরঁ দ্য লাভোয়াজিয়ে :
(ফরাসি ভাষায়: Antoine-Laurent de Lavoisier, ফরাসি উচ্চারণ: [ɑ̃twan lɔʁɑ̃ də lavwazje]; ২৬ আগস্ট ১৭৪৩ – ৮ মে ১৭৯৪;বা অ্যান্তনি ল্যাভয়সিয়ে ছিলেন একজন ফরাসি অভিজাত এবং রসায়নবিদ। তিনি আঠারো শতকের রসায়ন বিপ্লবের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে তার বড়ো প্রভাব আছে। তাকে প্রায়ই "আধুনিক রসায়নের জনক" হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
অ্যান্টোইন ল্যাভোয়াসিয়ে
(জন্ম: ২৬ আগস্ট, ১৭৪৩, প্যারিস, ফ্রান্স—মৃত্যু: ৮ মে, ১৭৯৪, প্যারিস) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ফরাসি রসায়নবিদ এবং ১৮ শতকের রাসায়নিক বিপ্লবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব যিনি অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়াশীলতার একটি পরীক্ষামূলক তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন এবং রাসায়নিক পদার্থের নামকরণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থার সহ-লেখক ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের আগে একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থদাতা এবং জনপ্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করার পর , সন্ত্রাসের সময় অন্যান্য অর্থদাতাদের সাথে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল ।
প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা
ল্যাভোয়াসিয়ে ছিলেন প্যারিসে বসবাসকারী এক ধনী বুর্জোয়া পরিবারের প্রথম সন্তান এবং একমাত্র পুত্র । যৌবনে তিনি জনসাধারণের কল্যাণের জন্য অস্বাভাবিক অধ্যয়নশীলতা এবং উদ্বেগ প্রদর্শন করেছিলেন। মর্যাদাপূর্ণ কলেজ মাজারিনে মানবিকতা এবং বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার পর, তিনি আইন অধ্যয়ন করেন। যেহেতু প্যারিসের আইন অনুষদ তার ছাত্রদের উপর খুব কম দাবি রাখে, তাই ল্যাভোয়াসিয়ে তার তিন বছরের বেশিরভাগ সময় আইনের ছাত্র হিসেবে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার উপর সরকারি ও বেসরকারি বক্তৃতা দিতে এবং নেতৃস্থানীয় প্রকৃতিবিদদের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে সক্ষম হন। আইন অধ্যয়ন শেষ করার পর, ল্যাভোয়াসিয়ে, তার বাবা এবং তার মাতামহের মতো, অভিজাত অর্ডার অফ ব্যারিস্টারে ভর্তি হন, যার সদস্যরা প্যারিসের হাইকোর্টে ( সংসদ ) মামলা উপস্থাপন করতেন। কিন্তু আইন অনুশীলনের পরিবর্তে, ল্যাভোয়াসিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করেন যা ১৭৬৮ সালে তাকে ফ্রান্সের প্রধান প্রাকৃতিক দর্শন সমাজ, প্যারিসের একাডেমি অফ সায়েন্সেস -এ ভর্তি করে ।
বায়ুসংক্রান্ত রসায়ন
ল্যাভোয়াসিয়ার ছাত্রাবস্থায় যে রসায়ন অধ্যয়ন করেছিলেন তা ধারণাগত স্পষ্টতা বা তাত্ত্বিক কঠোরতার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল না । যদিও রাসায়নিক লেখাগুলিতে রসায়নবিদদের অধ্যয়ন করা পদার্থ সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য ছিল, রাসায়নিক উপাদানগুলির সুনির্দিষ্ট গঠন বা গঠনের পরিবর্তনের ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে খুব কমই একমত ছিল। অনেক প্রাকৃতিক দার্শনিক এখনও গ্রীক প্রাকৃতিক দর্শনের চারটি উপাদান - পৃথিবী, বায়ু, আগুন এবং জল - কে সমস্ত পদার্থের প্রাথমিক পদার্থ হিসাবে দেখেছিলেন। ল্যাভোয়াসিয়ারের মতো রসায়নবিদরা "মিশ্রণ" (অর্থাৎ, যৌগ ) বিশ্লেষণের উপর তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছিলেন, যেমন অ্যাসিড ক্ষারীয় পদার্থের সাথে মিলিত হলে তৈরি লবণ । তারা আশা করেছিলেন যে প্রথমে সরল পদার্থের বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করে তারা যৌগগুলির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য তত্ত্ব তৈরি করতে সক্ষম হবেন ।
পূর্বে দাবি করা হয়েছিল যে উপাদানগুলি নির্দিষ্ট ভৌত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা পৃথক করা যায়: জল এবং পৃথিবী অসংকোচিত, বায়ু প্রসারিত এবং সংকুচিত উভয়ই করা যেতে পারে, যেখানে আগুনকে ধারণ বা পরিমাপ করা যায় না। ১৭২০-এর দশকে ইংরেজ ধর্মযাজক এবং প্রাকৃতিক দার্শনিকস্টিফেন হেলস দেখিয়েছিলেন যে বায়ুমণ্ডলীয় বায়ু কঠিন এবং তরল পদার্থে "স্থির" হয়ে গেলে তার "স্প্রিং" (অর্থাৎ, স্থিতিস্থাপকতা) হারায়। হেলসের মতে, সম্ভবত বায়ু আসলে কেবল বাষ্পের মতো বাষ্প ছিল এবং এর স্প্রিং, মৌলের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হওয়ার পরিবর্তে, তাপ দ্বারা তৈরি হয়েছিল । হেলসের পরীক্ষাগুলি নির্দিষ্ট বায়ু বা গ্যাসের পরীক্ষামূলক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ ছিল, যা একটি বিষয় যা বায়ুসংক্রান্ত রসায়ন নামে পরিচিত হয়েছিল ।
১৭৫০-এর দশকে স্কটিশ রসায়নবিদজোসেফ ব্ল্যাক পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেছেন যে নির্দিষ্ট কিছু বিক্রিয়ায় স্থির বায়ু রাসায়নিকভাবে সাধারণ বায়ু থেকে আলাদা। ব্ল্যাক জানতে চেয়েছিলেন কেন স্লেকড কুইকলাইম (হাইড্রেটেড ক্যালসিয়াম অক্সাইড) বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে এলে নিরপেক্ষ হয়। তিনি দেখতে পান যে এটি বায়ুমণ্ডলের শুধুমাত্র একটি উপাদান, কার্বন ডাই অক্সাইড , যাকে তিনি "স্থির বায়ু" বলেছিলেন, শোষণ করে। ব্ল্যাকের কাজ রাসায়নিকভাবে স্বতন্ত্র বায়ু সনাক্তকরণের জন্য নিবেদিত অনুসন্ধানমূলক প্রচেষ্টার সূচনা করে, যা শতাব্দীর শেষার্ধে গবেষণার একটি ক্ষেত্র দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। সুতরাং, ল্যাভোয়াসিয়ার যখন বায়ুর সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলির একটি নির্দিষ্ট সেটে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তখন বায়ুসংক্রান্ত রসায়ন একটি প্রাণবন্ত বিষয় ছিল: দহন , শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত ঘটনা এবং 18 শতকের রসায়নবিদরা যাকে ক্যালসিনেশন বলেছিলেন (ধাতুর পাউডারে [ক্যালক্স] রূপান্তর, যেমন লোহার মরিচা ধরে প্রাপ্ত ) ।
ভর সংরক্ষণ:
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভর সংরক্ষণ করা হয় এই দাবিটি তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকাশিত আবিষ্কারের পরিবর্তে আলোকিতকরণের গবেষকদের একটি ধারণা ছিল। ল্যাভোয়াসিয়ার বিশ্বাস করতেন যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পদার্থ তৈরি বা ধ্বংস হয় না , এবং তার পরীক্ষায় তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে এই বিশ্বাস লঙ্ঘিত হয়নি। তবুও তার দৃষ্টিভঙ্গি সর্বজনীনভাবে বৈধ কিনা তা প্রমাণ করতে তার অসুবিধা হয়েছিল। রসায়নবিদরা এই ধারণাকে আইন হিসেবে গ্রহণ করার জন্য তার দৃঢ়তা সমসাময়িক পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যায় পাওয়া অনুসন্ধানী মান এবং কার্যকারণ ব্যাখ্যায় রসায়নকে উন্নীত করার জন্য তার বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ ছিল।
অন্যান্য রসায়নবিদরাও রাসায়নিক বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে সক্ষম সংরক্ষণ নীতিগুলি খুঁজছিলেন, ল্যাভোয়াসিয়ার বিশেষভাবে তার অধ্যয়ন করা বিক্রিয়ায় জড়িত সমস্ত পদার্থ সংগ্রহ এবং ওজন করার জন্য আগ্রহী ছিলেন। তিনি যে অনেক বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন তাতে তার সাফল্য মূলত তার স্বাধীন সম্পদের কারণে হয়েছিল, যা তাকে তার নকশা অনুসারে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি তৈরি করতে সক্ষম করেছিল এবং প্রতিভাবান গবেষণা সহযোগীদের নিয়োগ এবং পরিচালনা করার ক্ষমতার কারণে। ফরাসি রসায়নের শিক্ষার্থীদের এখনও "লাভোয়াসিয়ারের আইন" হিসাবে ভর সংরক্ষণ শেখানো হয় তা এই নীতিকে আধুনিক রসায়নের ভিত্তি করে তোলার ক্ষেত্রে তার সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়।
রসায়নবিদের গল্প
১৭৩৫ সাল, ফ্রান্সের কোনো এক মফঃস্বলের যুবক জিয়ান অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়ে, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানী শহর প্যারিসে। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান হবার সুবাদে তার শিক্ষাজীবন কেটেছিল নির্বিঘ্নেই। তবে আইনজীবী হিসেবে নিজেকে কেবলমাত্র ‘স্বচ্ছল’ করে রাখতে নারাজ ছিলেন। নামের পাশে ‘সমৃদ্ধ’ শব্দটি নিজের করে নিতে রাজধানী শহরে আইনব্যবসা শুরু করেন। সে উদ্দেশ্য কত সহজেই না পূরণ করলো এই তরুণ। ১৭৪০ সালের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন প্যারিসের সবচেয়ে নামকরা উকিলদের একজন। নাম-যশের চূড়ায় বসে বিয়ে করেন বান্ধবী পাংক্টিসকে। তিন বছর পর রসায়নকে বদলে দেয়ার জন্য তাদের ঘরে জন্ম নেন অ্যান্টনি লরেন্ট ল্যাভয়সিয়ে। আজকের গল্পটা নবজন্ম নেয়া ল্যাভয়সিয়েকে নিয়েই।
জিয়ান ল্যাভয়সিয়ে তার জীবনে খুব কম মামলাতেই হেরেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হারটি ছিল ১৭৪৩ সালের আগস্ট মাসে। প্যারিসের কোনো এক অখ্যাত রসায়নবিদের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে মামলায় হারেন এই আইনজীবী। আর এর এক সপ্তাহ পরে, সে মাসেরই ২৬ তারিখ তার ঘর আলো করে আসে অ্যান্টনি লরেন্ট ল্যাভয়সিয়ে। ব্যাপারটি ছিল দারুণ কাকতালীয়। পিতা যার কাছে হেরেছেন, তারই পেশায় (রসায়নবিদ) পুত্র একদিন বিশ্বজয় করেছেন! যদিও জিয়ান ল্যাভয়সিয়ের প্রাথমিক ইচ্ছাই ছিল ছেলেকে নিজের মতো আইনজীবী হিসেবে গড়ে তুলবেন!
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ‘কলেজ ডেস কুয়াত্রে ন্যাশনস’ এ পড়ালেখা করেন ল্যাভয়সিয়ে। বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক থাকলেও বিজ্ঞানে তিনি ছিলেন বেশ দুর্বল। আবার মানবিক বিভাগের বিষয়গুলোতে ছিলেন দুর্দান্ত। তাহলে তো আইনজীবী হওয়াই তার জন্য বাঞ্ছনীয়! একদিকে বিজ্ঞানে দুর্বলতা, অন্যদিকে পিতার প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণায় কলেজ শেষ করে একটি ‘ল স্কুল’ এ আইন শিক্ষার জন্য ভর্তি হয়ে যান ল্যাভয়সিয়ে। সেখান থেকে স্নাতক শেষ করে ১৭৬৪ সালে আইনব্যবসা করার লাইসেন্সও পেয়ে যান। কিন্তু, বিজ্ঞানের প্রতি শৈশবের সে ঝোঁকটা যে তখনও রয়ে গেছে!
ল্যাভয়সিয়ের উত্থানটা ছিল খুবই নাটকীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আইন পড়ছেন, গোপনে তখন পড়ে চলেছেন বিজ্ঞান। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, রসায়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়ুয়া বেশ কিছু বন্ধু জুটিয়েছিলেন, যাদের সাথে রসায়নের নানান খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু, এভাবে পড়ালেখা করেই যে আইন পড়ুয়া এক তরুণ একটি গবেষণাপত্রই রচনা করে ফেলবেন, তা ভাবতে পেরেছিল কয়জন? আইনব্যবসা করার লাইসেন্স পেলেন যে বছর, সে বছরই ল্যাভয়সিয়ে তার জীবনের প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আর প্রথম গবেষণায়ই সাফল্য আসায়, আইনজীবী হিসেবে তার ক্যারিয়ারটা হলো একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। লেগে গেলেন রসায়নের পেছনে আর ১৭৬৯ সালের মধ্যে পেয়ে গেলেন ‘ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্স’ এর সদস্যপদ।
ফরাসি সায়েন্স একাডেমিতে গবেষণা করে বেশ কাটছিল দিনকাল। তবে নিজেকে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে তখনো প্রতিষ্ঠিত করা হয়ে ওঠেনি ল্যাভয়সিয়ের। এই অসম্পূর্ণ কাজটি তিনি সম্পূর্ণ করলেন ১৭৭২ সালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আবিষ্কারের মাধ্যমে। তিনি একটি স্বচ্ছ কাঁচের জারের মধ্যে এক টুকরো হীরক খণ্ড রেখে একটি শক্তিশালী বিবর্ধক কাঁচ দিয়ে সেটির উপর সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত করলেন। দেখতে দেখতে একসময় সম্পূর্ণ হীরক খণ্ডটি পুড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। হীরক খণ্ড সম্পূর্ণ পুড়ে যাবার পর তিনি জারের ওজন পরিমাপ করে দেখেন যে তা পূর্বের সমানই রয়ে গেছে। এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে তিনি যে মূল আবিষ্কারটি করেন, তা একটু পরে আলোচনা করা হবে। প্রাথমিকভাবে তিনি সে আবিষ্কারটি পর্যন্ত পৌঁছুতে না পারলেও, অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবিষ্কার করেন। একই পরীক্ষা তিনি চারকোলের ক্ষেত্রেও করেন এবং বিস্ময়ের সাথে দেখতে পান যে, উভয় ক্ষেত্রে একই গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, হীরা এবং কাঠকয়লা একই মৌলের দুটি ভিন্ন রূপ মাত্র। ল্যাভয়সিয়ে সে মৌলের নাম দেন কার্বন। আর বিজ্ঞানসমাজ তাকে দেয় ‘বিজ্ঞানী’ তকমা।
১৭৭৪ সালে জোসেফ প্রিস্টলি অক্সিজেন আবিষ্কার করেছেন বলে আমরা জানি। কিন্তু এই আবিষ্কারের দু’বছর পূর্বেই দহন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন ল্যাভয়সিয়ে, যা আদতে প্রিস্টলির জন্য সহায়ক হয়েছিল। তখন পর্যন্ত বিজ্ঞান সমাজে ‘ফ্লগিস্টন’ নামক একটি কাল্পনিক বস্তুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা হতো, যার উপস্থিতিতে দহন হয়! কিন্তু ল্যাভয়সিয়ে দৃঢ়ভাবে এই ভ্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭৭২ সালে এক গবেষণায় তিনি দেখেন যে, বাতাসে সালফার অথবা ফসফরাসের দহনে সৃষ্ট উৎপাদের ওজন উৎপাদকের চেয়ে বেশি। এ ব্যাপারটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, দহনের সময় ফসফরাস বাতাসের কোনো উপাদান শোষণ করে। সে উপাদানটি কী, তা-ই এখন মুখ্য প্রশ্ন।
১৭৭৪ সালে, মার্কারি অক্সাইডের বিশ্লেষণে প্রিস্টলি একটি বিশেষ গ্যাস আবিষ্কার করেন, যার উপস্থিতিতে দহনের হার অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। দুর্ভাগ্যক্রমে, ফ্লগিস্টনের ধারণা থেকে বের হতে না পেরে, দহনে সহায়তাকারী এ গ্যাসটিকে প্রিস্টলি ‘ডিফ্লগিস্টিকেটেড এয়ার’ বলে অভিহিত করেন। ল্যাভয়সিয়ে এই ডিফ্লগিস্টিকেটেড এয়ারের ব্যাপারটি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭৭৯ সালে ল্যাভয়সিয়ে, মার্কারি অক্সাইডের বিশ্লেষণে বিমুক্ত এই গ্যাসটির নাম দেন অক্সিজেন। তিনি বাতাসে এর পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগ হিসাব করেন। তিনি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেন যে, যখন সালফার কিংবা ফসফরাস বাতাসে পোড়ে, অক্সিজেনের সাথে এদের বিক্রিয়ায়ই নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয়। এর এক বছর আগে অবশ্য একটি অখ্যাত আবিষ্কারও করেছিলেন ল্যাভয়সিয়ে। তিনিই প্রথম সালফারকে একটি মৌলিক পদার্থ হিসেবে প্রমাণ করেন।
ভরের নিত্যতা সূত্র
- পদার্থকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা যায় মাত্র ।
- যেকোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উত্পন্ন পদার্থসমূহের মোট ভর, বিক্রিয়কগুলোর মোট ভরের সমান থাকে ।
উপরে যে হীরক খণ্ডের পরীক্ষার আলোচনা হয়েছে, সেটি মনে রেখেছেন তো পাঠক? ঠিক একইরকম ব্যাপার পুনঃরায় মার্কারি অক্সাইডের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেন ল্যাভয়সিয়ে। দেখা যায়, অক্সিজেন নিঃসরণের সাথে মার্কারি অক্সাইডের ওজন কমে যাচ্ছে। তবে, যে ঘটনাটি তাকে বিস্মিত করে তা হচ্ছে, মার্কারি অক্সাইডের হারানো ওজন, নিঃসৃত অক্সিজেনের ওজনের সমান। ব্যস, হয়ে গেল ইতিহাস গড়া! তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো বস্তুর ভরের পরিবর্তন ঘটে না। একইসাথে তৈরি হলো রসায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র, ভরের নিত্যতা সূত্র বা অবিনাশিতাবাদ সূত্র।
ল্যাভয়সিয়ের বিশ্বাস ছিল, দহন এবং শ্বসন একই প্রক্রিয়া। এই বিশ্বাস থেকে তিনি সাইমন লাপ্লাসের সাথে কাজ শুরু করেন। তারা একটি গিনিপিগের একক শ্বসনে নির্গত মোট কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং তাপের পরিমাণ নির্ণয় করেন। এরপর তারা পৃথকভাবে কার্বন দহন করে সমপরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করতে কতটুকু তাপ উৎপন্ন হয়, তা নির্ণয় করেন। উভয় ক্ষেত্রে উৎপন্ন তাপের পরিমাণ সমান হওয়ায় ল্যাভয়সিয়ে এবং লাপ্লাস সিদ্ধান্তে আসেন যে, স্তন্যপায়ীদের শ্বসনও একপ্রকার দহন। পরের বছর এই বিজ্ঞানীযুগল প্রমাণ করেন যে, পানি কোনো মৌলিক পদার্থ নয়। ১৭৮৪ সালে আরো একটি মৌলিক পদার্থ, হাইড্রোজেনের নামকরণ করেন ল্যাভয়সিয়ে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0