প্লেটোর জীবনী-biography of plato

প্লেটোর জীবনী

May 11, 2025 - 21:37
May 12, 2025 - 02:33
 0  1
প্লেটোর জীবনী-biography of plato

প্লেটো জীবন ও দর্শন

মারসন যখন বলেন, ‘প্লেটো হলো দর্শন আর দর্শন প্লেটো’ তখন আমাদেরকে এমন ভাবনায় পেয়ে বসে যে, এটি হয়ত একটি ভক্তিপূর্ণ আদিখ্যেতা; কিন্তু যখন আরও আধুনিককালে এসে অন্য অনেক দার্শনিককেই তাঁর দর্শনকে উচ্চমূল্যে মূল্যায়ন করতে দেখি, আমাদেরকে তাঁরা তাঁর ‘রাজনৈতিক তত্ত্ব, অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, নীতিবিদ্যা, ভাষা, শিল্প, প্রেম, গণিত, বিজ্ঞান ও ধমর্’-এর দর্শন সম্পর্কে অবহিত করেন, আমরা তাঁর মূল লেখাজোখা এবং ব্যাখ্যাকারদের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ পাঠ করি, অন্যান্য দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদদের ওপর তাঁর দর্শনের প্রভাব লক্ষ করি, তখন আমাদেরকে উক্ত ভাবনার পথেই এগিয়ে যেতে হয়।

যেমন, বিখ্যাত দার্শনিক হোয়াইটহেড্ যখন বলেন যে, ইউরোপীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে নিরাপদ সাধারণীকরণ হলো এই যে, এটি প্লেটোর পাদটীকার একটি সিরিজ নিয়ে গঠিত, অথবা বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন যে, ‘কোনো কোনো দার্শনিক হয়ত তাঁর মতো পরিসরে ও গভীরত্বে উপনীত হয়েছেন, কিন্তু কেউই তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি; প্লেটোর কট্টর সমালোচক কার্ল পপার বলেন যে, প্লেটোর কাজের প্রভাব (ভালো বা মন্দ যা-ই হোক না কেন) অপরিমেয়; এমন বলা যায় যে, পাশ্চাত্য চিন্তা হয় প্লেটোনীয়, না হয় প্লেটোবিরোধী, কিন্তু কদাচিৎ তা অ-প্লেটোনীয়’―তখন আমাদেরকে এমারসনের কথার যৌক্তিকতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হয়।


বিগত আড়াই হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে প্লেটোর দর্শন নিয়ে ব্যাপক চর্চা তো হয়েছেই আধুনিককালেও পাশ্চাত্যে (অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাভাষী দেশ এবং অঞ্চলেও) প্লেটোকে নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়েছে এবং হচ্ছে। হাল পুস্তকটি সেইসব চর্চা ও লেখাজোখাকে ভিত্তি করে বাংলা ভাষায় প্লেটোর জীবন, দর্শন এবং তার ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে রচনার একটি বিনীত প্রয়াস।

জন্ম:

শ্রেষ্ঠ গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আনুমানিক খৃস্টপূর্ব ৪২৭ থেকে ৪২৯ অব্দের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন এথেন্সে। তাঁর বাবার নাম এরিস্টন আর মায়ের নাম ছিলো পেরিষ্টন। অবশ্য তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিলো এরিসটোক্লিস। তিনি ছিলেন এথেন্সের এক ঐশ্বর্যশালী ও অভিজাত পরিবারের সন্তান এবং সক্রেটিসের পরম ভক্ত ও প্রিয় শিষ্য। দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুপুরুষ। তাঁর মুখাবয়বও ছিলো অপূর্ব সুন্দর।

প্লেটোর শৈশব-কৈশোরে এথেন্সের নগর-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা ছিলো অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে চলছিলো পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে এথেন্সের পরাজয়ের ভেতর দিয়ে। এর জন্য দায়ী করা হয় গণতন্ত্রকে। এথেন্সের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করার পেছনে কারণ ছিলো এই যে, পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের শেষদিকে অভিজাত শ্রেণীর লোকজন ক্ষমতা দখল করে বসেন।

‘থারটি টাইর‍্যান্টস’ (Thirty Tyrants) বলে কথিত সেই স্বৈরশাসকগোষ্ঠীর মধ্যে প্লেটোর আত্মীয়-স্বজনদেরও কেউ কেউ ছিলেন। তবে তাঁরা ক্ষমতা গ্রহণ করার পরও দেশের অবস্থার তেমন কোনো অগ্রগতি হলো না : অব্যাহত থাকে অন্যায়, অত্যাচার, রক্তপাত আর সন্ত্রাস। প্লেটো নিজে অভিজাত ছিলেন বলে জনগণের শাসন বা গণতন্ত্র ছিল তাঁর অপছন্দ। অন্যদিকে পাশাপাশি অভিজাতদের ব্যর্থতায়ও তিনি প্রচলিত রাজনীতির প্রতি হয়ে পড়েন বীতশ্রদ্ধ। এবং সেই যে যৌবনের শুরুতেই তিনি সকল কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে নির্জন-জীবন বেছে নেন ও জ্ঞান-সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন, অব্যাহত থাকে সেটা আমৃত্যু। অবশ্য দীর্ঘ জীবনের মাঝখানে দু’একবার যে কোনো কোনো শাসকসম্প্রদায়ের সংস্পর্শে এসে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নি, এমনও নয়।

প্লেটোর শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানা না গেলেও এটুকু জানা যায় যে, তিনি পেয়েছিলেন সেকালের সেরা শিক্ষা অর্জনের সুযোগ। দার্শনিক হেরাক্লেইটাসের অনুসারী ক্রেটাইলাস ছিলেন প্লেটোর শিক্ষক। আর এর থেকেই ধারণা করা যায়, জীবনের শুরুতেই এসেছিলেন। হেরাক্লেইটাসের দার্শনিক চিন্তাধারার সংস্পর্শে। যৌবনের প্রথমদিকে তিনি কিছুকাল কাব্যচর্চাও করেন। দার্শনিক এনাক্সাগোরাস ও সোফিস্টদের দ্বারাও প্রথম দিকে তিনি যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিলেন তবে প্লেটোর জীবনে সব থেকে গভীর আর স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিলেন তার পরম শ্রদ্ধাভাজন গুরু সক্রেটিস। সক্রেটিসের জীবনের শেষ আট বছর তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থেকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর পরিণত চিন্তাধারায় সিক্ত হন। সক্রেটিসই হয়ে ওঠেন প্লেটোর জীবনের অনন্য আদর্শ।

শৈশব ও শিক্ষা

প্লেটো যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা শিক্ষা গ্রহণের জন্য ছিল সুবিশেষ অনুকূল। এই সুযোগের সঠিক সদ্ব্যবহার করেতে পেরেছিলেন প্লেটো। সমকালীন শিক্ষার সবরকম সুযোগ-সুবিধাই তিনি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। হেরাক্লিটাসের একটি বিখ্যাত দার্শনিক মত ছিল, পরিবর্তনশীল ইন্দ্রিয়জগৎ সম্পর্কে কোন স্থিত জ্ঞান সম্ভব নয়।

প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র তত্ত্ব

"সদগুণই জ্ঞান' এবং 'ন্যায়ধর্ম জ্ঞান সমতুল্য' শিক্ষাগুরু মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের এ মৌলিক সূত্র প্লেটোর চিন্তাধারায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এ মৌলিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্লেটো তাঁর বিখ্যাত 'The Republic' গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্ব আলোচনা করেন। তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্বের মূল বিষয় হল রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং সুন্দর জীবনের বিকাশ সাধন করা।
প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে জনগণের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্কের উপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। প্লেটোর মতে, "মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিভিন্নতায় এবং সেগুলোর পরিতৃপ্তির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।" তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক মতবাদের সাথে সমন্বয় সাধন করেন নি।

এজন্য বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সরদার ফজলুল করিম 'প্লেটোর রিপাবলিক' এর অনুবাদ গ্রন্থে বলেছেন, "ঐতিহাসিক কোন পর্যায়ক্রম প্লেটো এখানে অনুসরণ করেন নি। সমসাময়িক গ্রিসীয় নগররাষ্ট্র আদিতে যেমন করে গঠিত হয়ে থাকতে পারে, তারই একটি কল্পনা উপস্থিত করা হয়েছে।
এরূপ রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিশ্লেষণ করে তার মূল উপাদানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে গঠন করা হয়েছে।" তাই প্লেটো বলেছেন, "রাষ্ট্র একপ্রকার মনোজাত ফসল; এটা কোন চুক্তির ফল নয়।"

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্বের পরিকল্পনা কল্পনা বিলাসমাত্র বা সম্পূর্ণরূপে সর্বাত্মক প্রকৃতির; তথাপি এ তত্ত্বের কিছু গুণ লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক যুগের ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতি প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র তত্ত্ব মতবাদের নিকট দায়ী।
মোটকথা, বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতি সাধনে যেসব মনীষীর অবদান চিরভাস্কর তাঁদের মধ্যে গ্রিক চিন্তাবিদ প্লেটোর তত্ত্ব অন্যতম। আর এ বিখ্যাত মনীষীর চিন্তাধারার মধ্যে আদর্শ রাষ্ট্র তত্ত্বটি অন্যতম।

শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্লেটোর মতবাদ

প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যার দ্বারা একটি সমাজের ইউনিটসমূহ সামাজিক চেতনা ও প্রেরণায় ভরপুর করে তোলে এবং সামাজিক চাহিদাগুলো পরিপূর্ণ করে। এটি এমন একটি মাধ্যম যার দ্বারা ব্যক্তি অতি সহজেই সমাজে নিজেকে খাপখাইয়ে নিতে পারে এবং নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যেতে প্রেরণা লাভ করে।
প্লেটো ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। প্লেটোর কল্পিত আদর্শ রাষ্ট্রের মূলভিত্তি ছিল শিক্ষাব্যবস্থা। প্লেটোর মতে, "ভালো শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে যে কোন উন্নতি সম্ভবপর। কাজেই শিক্ষাকে যদি অবহেলা করা হয় তবে রাষ্ট্র অন্য যা কিছুই করুক তাতে কিছুই আসে যায় না।"

প্লেটোর শিক্ষার বিশেষ লক্ষ্য: শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্লেটো কতকগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। যথাঃ
  • নরনারীর সমশিক্ষা: নরনারীর জন্য সর্বত্র একই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। কেননা মানুষ হিসেবে দু'জনেই সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।
  • জাস্টিস বা ন্যায় প্রতিষ্ঠা: মানবসমাজের সর্বত্র জাস্টিস প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষা ছার মাধ্যমে তিনি গোটা সমাজের পরিবর্তনের আশাবাদী ছিলেন।
  • আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন: আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য শাসকের প্রয়োজন। একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষার সাহায্যেই যোগ্যতম শাসন সৃষ্টি করা সম্ভব। প্লেটোর ধারণায় প্রকৃত জ্ঞান ও গুণের অধিকারী শাসক শ্রেণী তৈরি করা শিক্ষার অন্যতম অথচ প্রধানতম লক্ষ্য
  • পরিপূর্ণ সত্তায় বিকশিত: ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ সত্তায় বিকশিত করে রাষ্ট্রীয় জীবনে অনুশীলনের যোগ্য করে তোলাই ছিল প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থার প্রধানতম লক্ষ্য।
  • নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা: প্লেটো শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার পথে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেননা শিক্ষা যদি ব্যক্তি বা বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত হয় তবে ব্যক্তি স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়তে বাধ্য। কিন্তু তা কোন আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য প্রত্যাশিত নয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, প্লেটো তৎকালীন সমাজব্যবস্থার উপর নির্ভর করে তাঁর শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। তাই তাঁর তত্ত্বে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতেই পারে। তবুও তাঁর প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা যে একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা এবং রিপাবলিক' গ্রন্থ যে শিক্ষার উপর লিখিত উত্তম গ্রন্থ এটি বেশিরভাগ দার্শনিকই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন।

সাম্যবাদ সম্পর্কে প্লেটোর মতবাদ

মহান গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর অমর গ্রন্থ 'The Republic' এ বর্ণিত আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়নকল্পে তিনি দু'টি উপায়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। এদের একটি হল শিক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যটি হল সাম্যবাদ তত্ত্ব।
একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য যদিও প্লেটো শিক্ষাব্যবস্থার উপর খুব জোর দিয়েছেন, তথাপি তিনি সাম্যবাদকে উপেক্ষা করতে পারেন নি। প্লেটোর সাম্যবাদ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের এক অনবদ্য সৃষ্টি।
প্লেটোর সাম্যবাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য: প্লেটোর সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য হল আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন করা
এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
প্লেটো তাঁর সাম্যবাদ তত্ত্বে শাসক ও যোদ্ধাশ্রেণীর সম্পত্তি ও পরিবার উচ্ছেদের কথা বলেছেন। কারণ সম্পত্তি ও পরিবার শাসক ও যোদ্ধাশ্রেণীকে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করে, যা আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়নে নানারূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তাই প্লেটো বলেছেন, "একমাত্র সাম্যবাদের মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিক চেতনা পরিবর্তিত হয়ে সমাজকেন্দ্রিক হতে পারে।"
তাঁর সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তির চিত্তকে সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ করে ন্যায়ধর্মের অনুগত্য করা। ওয়েপার (Wayper) প্লেটোর চিন্তাধারার বিশ্লেষণ করে বলেছেন, তাঁর সময়ে বহু রাষ্ট্রে প্রকট বৈষম্য বিরাজ করত এবং এ কারণে তারা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। প্লেটোর চিন্তাধারা আধুনিককালের মার্কসের ও এঙ্গেলসের শ্রেণীবৈষম্য ও শ্রেণীসংগ্রামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্লেটোর সাম্যবাদ সমাজের সকল শ্রেণীর জন্য নয়। তার মূল লক্ষ্য ছিল আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন করা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তার সাম্যবাদ উৎপাদক শ্রেণীর জন্য কার্যকর নয়। এটা কেবলমাত্র রাষ্ট্রের অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য। মূলত আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্যবাদ হলো একটি বৈষয়িক অর্থনৈতিক অনুসিদ্ধান্ত।

প্লেটোর দার্শনিক রাজার গুণাবলি

প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের মহান দায়িত্ব পালনে যেসব ব্যক্তি দার্শনিক রাজার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত হবেন, তাদের অবশ্যই অনেক গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। নিম্নে দার্শনিক রাজার উল্লেখযোগ্য গুণাবলি সংক্ষেপে বর্ণিত হলো:
  • তিনি হবেন মনোরম ব্যক্তিত্ব ও সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারী।
  • তিনি হবেন ন্যায়ের প্রতীক এবং অজ্ঞতা ও মূর্খতা হতে মুক্ত ও স্বাধীন।
  • তার আত্মা হবে সর্বপ্রকার কলুষতা, লোভ ও লালসা মুক্ত।
  • তাদের সহায় সম্পত্তির প্রতি কোন মোহ থাকবে না।
  • উদারতা ও মহত্ত্ব হবে চারিত্রিক ভূষণ।
  •  তাদের বোধশক্তি যেমন হবে প্রখর, তেমনি স্মরণশক্তিও।
  • রাষ্ট্রের ন্যায়তত্ত্বের প্রতি হবেন পণ্ডিত এবং তা অনুশীলনে হবেন অবিচল ও ধৈর্যশীল।
  • তিনি হবেন যেমন আইনের উৎস, তেমন আইনের ব্যাখ্যাকারক।
  • তিনি হবেন দৈহিক দিক থেকে সবল, মনের দিক থেকে সাহসী এবং সঙ্গীতপ্রিয়তা হবে তার শখ।
  • আচরণে থাকবে ভদ্রতা, ব্যবহারে নম্র এবং বুদ্ধিতে যুক্তিবাদী।
  •  আবেগময় বুদ্ধি ও যুক্তি দ্বারা পরিচালিত।
  • তনি সকলের কল্যাণ কামনা করবেন এবং সকলে তার মঙ্গল কামনা ও আশীর্বাদ করবে।
  •  তিনি যোদ্ধা ও উৎপাদক শ্রেণীর মাঝে সমন্বয়ক।
  •  তাদের জীবনে যেমন থাকবে প্রাচুর্যতা, তেমনি পাশাপাশি থাকবে দরিদ্রতা।
পরিশেষে বলা যায় যে, সামগ্রিকভাবে প্লেটোর চিন্তাধারা ও দর্শনের পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁর সমসাময়িক কালের অপরাপর দার্শনিকদের চিন্তার প্রভাব পড়েছে তাঁর উপর। আদর্শ রাষ্ট্রে দার্শনিক রাজা সকল আইনের ঊর্ধ্বে।
প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনায় দার্শনিক রাজাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। দার্শনিক রাজা তার প্রজ্ঞা দ্বারা রাষ্ট্র শাসন করার ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাশালী হবেন।

গ্রন্থাবলি

প্লেটো রচিত গ্রন্থাবলির নাম ও বিষয়বস্তুঃ

  • এপোলজি (Apology) এথেন্সের আদালতে সক্রেটিস কীভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন, এ গ্রন্থে প্লেটো তারই বর্ণনা দিয়েছেন,
  • ক্রিটো (Crito) তে সক্রেটিসকে একজন বিশ্বস্ত রাজভক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে ;
  • ইউথ্রিফ্রনে (Euthyphron) ধর্মের প্রকৃতি,
  • ল্যচেস (Laches) এ সাহসিকতা,
  • আইয়নে (Ion) অনুধ্যানবিহীন সেনাপতি ও কবি ব্যক্তি সম্পর্কিত,
  • প্রোটাগোরাস (Protagoras) এ তার অযথার্থবাদ ও সক্রেটিসের যথার্থবাদের আলোচনা,
  • চারমাইডিসে (Charmydes) মিতাচার সম্পর্কে,
  • লাইসিসে (Lysis) বন্ধুত্ব সম্পর্কে,

মহান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্লেটো খ্রাষ্টপূর্ব ৩৪৭অব্দে ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0